রাশিয়ায় পৌঁছে গেছে যুদ্ধের বিভীষিকা

রুশ সেনাদের লক্ষ্য করে ২এস২২ বোহদানা স্বচালিত হাউইটজার থেকে গোলা ছুড়ছেন এক ইউক্রেনীয় সেনাসদস্য। ছবি: রয়টার্স
তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের প্রভাব এবার রাশিয়ার ভেতরেও স্পষ্ট। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিরাপদ বলে পরিচিত এলাকাগুলোতেও এখন আতঙ্ক। জ্বালানির সংকট বাড়ছে। মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আবারও শান্তি আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
রাশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে উরাল পর্বতমালার ওপারের অঞ্চলকে বিদেশি হামলা থেকে নিরাপদ বলে মনে করা হতো। ১৮১২ সালে নেপোলিয়নের আক্রমণ এবং ১৯৪১ সালে নাৎসি জার্মানির হামলার সময়ও মানুষ ও সামরিক কারখানা সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল সেখানে।
কিন্তু এখন সেই নিরাপত্তার ধারণা আর নেই।
এপ্রিলের শেষ দিকে ইউক্রেনের একঝাঁক ড্রোন উরাল অঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র ইয়েকাতেরিনবার্গে হামলা চালায়। শহরটি ইউক্রেন সীমান্ত থেকে ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যন্ত্রাংশ তৈরির একটি কারখানা লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইউক্রেন। প্রথম হামলার পর থেকে ইয়েকাতেরিনবার্গ বিমানবন্দর অন্তত পাঁচবার বন্ধ রাখা হয়েছে।
মাসের পর মাস তেল শোধনাগার ও জ্বালানি গুদামে ইউক্রেনের হামলার প্রভাব এখন সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়ছে। খাদ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দেখা দিয়েছে পেট্রলের সংকট।
ইয়েকাতেরিনবার্গের ৪৫ বছর বয়সী ব্যবসায়ী আনাতোলি জানিয়েছেন, প্রতিদিনই দাম বাড়ছে। দোকানপাট বন্ধ হচ্ছে। পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইন পড়ছে। বেশি দামে বিক্রির আশঙ্কায় অনেক জায়গায় পাত্রে করে জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলছেন, মানুষ বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে। তাই অনেকেই খাবার মজুদ করতে শুরু করেছেন। যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে নিজের পুরো নাম প্রকাশ করেননি তিনি।
আনাতোলি বললেন, তার পরিচিতদের বেশির ভাগই যুদ্ধের বিরোধী। ইউক্রেনের হামলা ভালো লাগে না। তবে এটাকে তারা প্রাপ্য বলেই মনে করেন।
এদিকে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি রাশিয়ার গ্রীষ্মকালীন সামরিক অভিযান। লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা দক্ষিণ-পূর্ব ডনবাস অঞ্চলের বাকি অংশ দখল করা। পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণে আরও এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া।
এর মধ্যেই আবার শান্তি আলোচনার কথা বলেছেন পুতিন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর যে আলোচনা থেমে গিয়েছিল, সেটি আবার শুরু করার আগ্রহ দেখিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) পুতিন বলেছেন, ২০২২ সালের ইস্তাম্বুল চুক্তির ভিত্তিতে ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত রাশিয়া।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার বেশির ভাগ শর্ত ইউক্রেন মেনে নেবে না। তাদের ধারণা, কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে সময় কিনতেই এই উদ্যোগ নিয়েছেন পুতিন।
জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন বলছেন, ২০২২ সালের শরতের পর এবারই প্রথম যুদ্ধ জয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে ইউক্রেনের। উত্তরের এলাকায় রুশ বাহিনীকে পিছু হটানোর অভিযান সেই সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বাড়ছে রুশ সেনাদের মধ্যে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও।
রুশ সেনাদের দেশ ছাড়তে সহায়তা করা সংগঠন ‘ইদিতে লেসম’-এর প্রতিনিধি ইভান চুভিলিয়ায়েভ জানিয়েছেন, রুশ বাহিনীর অগ্রগতি যত আটকে যাচ্ছে, সেনা পলায়নের ঘটনাও তত বাড়ছে।
এদিকে রাশিয়ার দাবিগুলো তুলে ধরেছেন ক্রেমলিনপন্থী বিশ্লেষক সের্গেই মার্কভ।
তিনি বললেন, ইউক্রেনকে ‘নাৎসিমুক্ত’ করতে হবে। ভারী অস্ত্র ও সেনাসংখ্যায় সীমা আনতে হবে। দেশটিকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। ন্যাটোতে যোগ দেওয়া যাবে না। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে পশ্চিমা দেশ ও রাশিয়াকে।
তিনি আরও বললেন, ইউক্রেনে রুশ ভাষার ওপর যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা তুলে নিতে হবে। দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগও দেওয়া যাবে না।
মার্কভের মতে, ইউক্রেনকে ডনবাস ছাড়তে হবে। কোনো না কোনো আইনি কাঠামোর মাধ্যমে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
তিনি বলছেন, যেকোনো শান্তি চুক্তি ইউক্রেনের ‘বৈধ’ নেতার সঙ্গে হতে হবে। এর মাধ্যমে তিনি প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়ে মস্কোর পুরনো দাবির পুনরাবৃত্তি করেন।
তবে সামরিক আইন জারি থাকায় ইউক্রেনে নির্বাচন হয়নি।
ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণও পরে ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধীরে ধীরে এগিয়েছে রুশ বাহিনী। যদিও এতে তাদের কয়েক দশ হাজার সেনা হতাহত হয়েছে। চলতি বছরে এসে সেই অগ্রগতি প্রায় থেমে গেছে।
ডনবাসে এখনো ধীরগতিতে এগোচ্ছে রাশিয়া। তবে মিত্রোখিনের মতে, এই অগ্রগতি পেছনের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবে না। কারণ ইউক্রেনের ড্রোন এখন ক্রমেই রুশ বাহিনীর সরবরাহ পথ নিয়ন্ত্রণ করছে।
তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত রুশ বাহিনীকে পিছু হটতে হতে পারে।
নির্বাসিত রুশবিরোধী কর্মী সের্গেই বিজিয়কিন বলেছেন, যুদ্ধের শুরুতে সমর্থক-বিরোধী সবাই দ্রুত জয়ের আশা করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যুদ্ধের সমর্থকরাও বুঝেছেন, পুতিন অলৌকিক কিছু করতে পারবেন না। রাশিয়া আবার বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির পুরনো বাস্তবতায় ফিরছে।
তিনি মনে করছেন, রাশিয়ার মানুষের সহ্য করার ক্ষমতা অনেক বেশি। অনেকেই যুদ্ধের বিরোধী। তবু তারা সবকিছু মেনে নিয়ে এই যুদ্ধের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আর যারা সক্রিয় ছিলেন, তারা অনেক আগেই দেশ ছেড়েছেন।
ড্রোন হামলার ভয়ে মস্কো ছেড়ে গ্রামেও যাচ্ছেন অনেকে। তবে সেখানেও পুরোপুরি নিরাপত্তা নেই।
মস্কোর কপিরাইটার আরসেনি ইয়ারোস্লাভ অঞ্চলে নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। এলাকাটি রাজধানী থেকে ২৮০ কিলোমিটার দূরে। যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে তিনিও নিজের পুরো নাম প্রকাশ করেননি।
তিনি জানিয়েছেন, মস্কোর তুলনায় সেখানে বাতাস অনেক পরিষ্কার। জুনের মাঝামাঝি একটি বড় তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার পর রাজধানীতে কালো ও বিষাক্ত ‘তেলের বৃষ্টি’ হয়েছিল।
তবে গ্রামেও ড্রোনের শব্দ শোনা যায়। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিস্ফোরণও শোনা যায়।
তিনি আরও জানিয়েছেন, দুই দিন আগে তাদের বাড়ি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়। বিস্ফোরণে বাড়িটি তিনবার কেঁপে ওঠে।
১১ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সুইডেনের কিয়েল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমি এবং স্টকহোম ইনস্টিটিউট অব ট্রানজিশন ইকোনমিকস জানিয়েছে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলা রাশিয়ার অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার অর্থনীতি এখনো ধসে পড়েনি। তবে এর ভিত্তি দ্রুত দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে রাশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি দেখে অনেক ইউক্রেনীয় এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করছেন।
কিয়েভের লুকিয়ানিভকা এলাকার বাসিন্দা ও আর্থিক পরামর্শক হান্না ওনোপ্রিয়েঙ্কো বলেছেন, জার্মান শব্দ ‘শ্যাডেনফ্রয়েড’ তার অনুভূতিকে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করে। অর্থাৎ অন্যের দুর্ভোগে এক ধরনের তৃপ্তি।
তার এলাকায় বহুবার রুশ ড্রোন হামলা হয়েছে। মে মাসের শেষ দিকে এক হামলায় তিনজন নিহত হন। আহত হন কয়েক ডজন মানুষ। একটি মেট্রো স্টেশনের ওপরের শপিং সেন্টারও পুড়ে যায়।
হান্না বলছেন, তারপরও তিনি জানেন, রাশিয়ার মানুষ এখন যে পরিস্থিতির মুখোমুখি, তা ইউক্রেনের মানুষের ভোগান্তির মাত্র পাঁচ শতাংশ।
সূত্র : আল জাজিরা




