জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ
‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিনারায় বিশ্ব’, বড় বদলের ডাক মহাসচিব প্রার্থীর

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে আমূল ঢেলে সাজানোর ডাক দিলেন মহাসচিব পদপ্রার্থী ইভোন এ-বাকি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যে পাঁচ শক্তিধর দেশের হাতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন ও ভেটো ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছিল, আট দশক পরেও ছবিটা প্রায় একই। অথচ বদলে গিয়েছে বিশ্ব, জনসংখ্যা ও ক্ষমতার ভারসাম্য। আফ্রিকার ৫৪টি দেশ থাকলেও স্থায়ী আসন নেই একটিও। সেই বৈষম্যের দিকেই আঙুল তুলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে আমূল ঢেলে সাজানোর ডাক দিলেন মহাসচিব পদপ্রার্থী ইভোন এ-বাকি। তার সতর্কবার্তা আরও চড়া, বিশ্ব এখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় কিনারায়। এই অবস্থায় পুরনো কাঠামো আঁকড়ে থাকলে জাতিসংঘ বারবার অচলই হয়ে পড়বে।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক সংলাপে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন ৭৫ বছরের এই ইকুয়েডরীয় কূটনীতিক। তার বক্তব্য, নিরাপত্তা পরিষদ এখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ’পড়ে আছে’। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্স–এই পাঁচ দেশই এখনও স্থায়ী সদস্য এবং প্রত্যেকের হাতে রয়েছে ভেটো ক্ষমতা। অথচ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও বিশ্বের অন্য বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব সেই কাঠামোয় যথেষ্ট নয়। এই অসম প্রতিনিধিত্ব ও ভেটোকেন্দ্রিক ব্যবস্থাই পরিষদকে বারবার মতবিরোধে আটকে দিচ্ছে বলে তার অভিযোগ।
নিজের নির্বাচনী রূপরেখাতেও বাকি আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও এশিয়ার মতো ঐতিহাসিক ভাবে কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া অঞ্চলের স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে এমন ভেটোব্যবস্থার পরিবর্তন চান, যা বহু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদকে সিদ্ধান্তহীন করে দেয়। তার মতে, একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বকে সামলাতে হলে পরিষদকেও এই শতাব্দীর প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে হবে।
শুধু কাঠামো বদল নয়, মহাসচিব হলে নিজের কাজের ধরনও বদলাতে চান বাকি। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ৩৮তম তলায় বসে শুধু বিবৃতি দেওয়া নয়, সরাসরি সংঘাতের জায়গায় গিয়ে মধ্যস্থতা করতে চান তিনি। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পরে ক্ষয়ক্ষতি সামলানোর বদলে সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই তা ঠেকানোকে জাতিসংঘের প্রথম কাজ করতে হবে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৬০টির বেশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সংঘাত চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজনে তিনি নিজেই যুদ্ধক্ষেত্র ও উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় গিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলবেন।
এই যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের পেছনে রয়েছে বাকির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও। ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিলে লেবানিজ অভিবাসী পরিবারে জন্ম তার। পরে লেবাননে গিয়ে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। বৃহস্পতিবার সেই স্মৃতি টেনে তিনি জানান, চার দশকেরও বেশি আগে বৈরুতের একটি ভূগর্ভস্থ আশ্রয়ে তিন সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বসেছিলেন তিনি, যখন চারপাশে বোমা পড়ছিল। সন্তানরা বেঁচে গেলে জীবন শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে উৎসর্গ করবেন, সেই মুহূর্তেই এমন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বলে জানান বাকি।
পরবর্তী সময়ে সেই শান্তি আলোচনার অভিজ্ঞতাও এসেছে তাঁর কর্মজীবনে। ইকুয়েডর ও পেরুর দীর্ঘ সীমান্তবিরোধ অবসানে ১৯৯৮ সালের শান্তিচুক্তির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। পরে ইকুয়েডরের মন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও ফ্রান্সে রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই অভিজ্ঞতাকেই জাতিসংঘে সংঘাত ঠেকানোর কাজে ব্যবহার করতে চান তিনি।
বিশ্বের চলমান যুদ্ধগুলোর শান্তি আলোচনায় নারীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাকি। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে ইসরায়েল-গাজা সংঘাত, বড় বড় শান্তি উদ্যোগে নারীর উপস্থিতি খুবই কম বলে তাঁর অভিযোগ। তাঁর মতে, নারী আলোচকেরা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসতে পারেন এবং আপসের জায়গা তৈরিতে সহায়তা করতে পারেন। “আমরা প্রায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিনারায়,” বলতে গিয়ে তিনি মনে করিয়ে দেন, সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা।
এমনকি নিজের সাত বছরের নাতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। টেলিভিশনে ইউক্রেন যুদ্ধ দেখে শিশুটি নাকি তাঁকে বলেছিল, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে বাড়িতে রাতের খাবারে ডেকে “বন্ধু বানিয়ে দিতে”। শিশুটির ভাষায়, “এটা কঠিন নয়।” সেই ঘটনার উল্লেখ করে বাকি বোঝাতে চান, রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে সরাসরি সংলাপের জায়গা এখনও রয়েছে।
শেষ মুহূর্তে দৌড়ে বাকি
জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে বাকি ঢুকেছেন একেবারে শেষ দিকে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র টোঙ্গা তাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে মনোনয়ন দেয়; ১৮ আগস্ট জাতিসংঘ সেই মনোনয়ন প্রকাশ করে। এর ফলে তিনি মহাসচিব পদের দৌড়ে অষ্টম প্রার্থী এবং ইকুয়েডর থেকে দ্বিতীয় প্রার্থী হন। আর এক ইকুয়েডরীয় প্রার্থী হলেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি মারিয়া ফের্নান্দা এস্পিনোসা।
জুলাইয়ের শেষে নিরাপত্তা পরিষদের প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে বাকি ছিলেন না। সেখানে কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান অল্প ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। তার পিছনে ছিলেন গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান, আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি। বাকির মনোনয়ন পরে হওয়ায় শুক্রবারের দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক ভোটে প্রথমবার তার সমর্থনের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হওয়ার কথা।
বাকির প্রার্থিতা ঘিরে আর একটি বিষয়ও নজরে রয়েছে। তিনি আগেই ইকুয়েডরের একটি বেতারমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, তার প্রার্থিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে নিজের বন্ধুত্বের কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন তিনি। তবে তাঁর প্রতি সমর্থনের বিষয়ে ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিক ভাবে এখনও কিছু বলেনি।
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় ও শেষ পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৩১ ডিসেম্বর। তার উত্তরসূরি বাছাইয়ের আসল চাবিকাঠি অবশ্য সেই নিরাপত্তা পরিষদেরই হাতে, যে পরিষদের কাঠামো বদলাতে চাইছেন বাকি। ১৫ সদস্যের পরিষদ প্রথমে একজনকে সুপারিশ করবে; পরে সাধারণ পরিষদ তাকে নিয়োগ দেবে। বাস্তবে নির্বাচিত হতে হলে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্স–পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কারও ভেটোর মুখে পড়া চলবে না। ভোটের একাধিক পর্ব সেপ্টেম্বরের শেষ কিংবা অক্টোবর পর্যন্তও গড়াতে পারে।
এখানেই বাকির প্রস্তাবের রাজনৈতিক বৈপরীত্যও সবচেয়ে স্পষ্ট। যে পাঁচ দেশের বিশেষ ক্ষমতার সংস্কার চান তিনি, জাতিসংঘের শীর্ষ পদে বসতে হলে আপাতত সেই পাঁচ দেশেরই বাধাহীন সম্মতি প্রয়োজন। বিশ্বকে বদলাতে নিরাপত্তা পরিষদ বদলের ডাক তিনি দিয়েছেন; কিন্তু সেই পরিবর্তনের লড়াই শুরু করার আগেই তাঁকে পেরোতে হবে বর্তমান ব্যবস্থার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি–ভেটোর দরজা।






