নীতি বদলে মিয়ানমারের জান্তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ, স্বার্থ কী

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গে গার্ড অব অনার পরিদর্শন করছেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। ফাইল ছবি : রয়টার্স
মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির জেনারেলদের বিচ্ছিন্ন রাখতে যে নীতি নিয়েছিল ওয়াশিংটন, এই পদক্ষেপ তার বড় পরিবর্তন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বৃহস্পতিবার এমন একটি এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন এই যোগাযোগের মূল কারণ আপাতত মিয়ানমারে থাকা অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধ করা। এসব কেন্দ্র থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লক্ষ্য করে নানা ধরনের প্রতারণা চালানো হয়।
তবে আলোচনার পরিধি আরও বড় হতে পারে। এর মধ্যে মিয়ানমারের বিরল খনিজ সম্পদ নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
এই যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণা ব্যুরোর সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্স।
গত সেপ্টেম্বরে তিনি মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অভ্যুত্থানের পর এটিই ছিল দেশটির সামরিক সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ।
কেন হঠাৎ এই যোগাযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতিবদলের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় বড় আকারের অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব কেন্দ্র থেকে প্রেমের সম্পর্কের নামে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ চালানো হয়। এতে মার্কিন নাগরিকেরা কোটি কোটি ডলার হারিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র চায়, মিয়ানমারের সামরিক সরকার এসব কেন্দ্র বন্ধ করতে সহযোগিতা করুক। এ নিয়ে এফবিআইয়ের সঙ্গেও মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের সরাসরি যোগাযোগ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
তবে এখানে বড় একটি প্রশ্ন আছে। এসব প্রতারণাকেন্দ্রের অনেকগুলোই এমন এলাকায় রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। কিছু ক্ষেত্রে এসব কর্মকাণ্ড থেকে পাওয়া অর্থ সামরিক বাহিনীর কাছেও যায় বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। ফলে সামরিক সরকার আসলে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
বিরল খনিজও গুরুত্বপূর্ণ
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মিয়ানমারের বিরল খনিজ সম্পদ। বিরল খনিজ বলতে মূলত পর্যায় সারণির ১৭টি বিশেষ ধাতব মৌল এবং ভারী বিরল খনিজকে একত্রে বোঝানো হয়, যা আধুনিক প্রযুক্তি, সবুজ শক্তি এবং অস্ত্র তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ আধুনিক প্রযুক্তি তৈরিতে ভারী বিরল খনিজ গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারে এসব খনিজের বড় মজুত রয়েছে। বর্তমানে এসব খনিজের প্রধান ক্রেতা চীন।
যুক্তরাষ্ট্র এখন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। তাই মিয়ানমারের বিরল খনিজ নিয়ে ওয়াশিংটনের আগ্রহও বাড়ছে।
তবে এখানেও বাধা আছে। এসব খনিজের বড় অংশ এমন এলাকায় রয়েছে, যেগুলো মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরোধী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে। ফলে শুধু সামরিক সরকারের সঙ্গে আলোচনা করলেই খনিজ পাওয়া সহজ হবে না।
তার ওপর মিয়ানমারের খনিজ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশকে চীন কীভাবে দেখবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
একজন মার্কিন নাগরিকের মুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ
নতুন যোগাযোগের আরেকটি দরজা খুলেছে এক মার্কিন ব্যবসায়ীর আটকের ঘটনায়।
মিয়ানমারে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের সাবেক প্রধান অ্যাডাম কাস্তিয়োকে গত জুনে ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরে আটক করা হয়েছিল। তার সমর্থকেরা অভিযোগ করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সাজানো।
কাস্তিয়োর মুক্তির জন্য হোয়াইট হাউস, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ও পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা মিয়ানমারের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
একজন কর্মকর্তার মতে, এর বিনিময়ে মিয়ানমার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সঠিক পর্যায়ে’ আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ চেয়েছিল। পরে কাস্তিয়ো মুক্তি পান। তিনি তার মুক্তির জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
এরপরই দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
২০২১ সালের পর পুরোপুরি বদলে গেল নীতি
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
জো বাইডেনের প্রশাসন মিয়ানমারের সম্পদ জব্দ করে। সামরিক কর্মকর্তাদের ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
২০২২ সালে মার্কিন কংগ্রেস সামরিক সরকারের বিরোধীদের জন্য প্রাণঘাতী নয় এমন সহায়তার অনুমোদন দেয়। বিমান হামলার আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং সামরিক কর্মকর্তাদের জান্তার পক্ষত্যাগে উৎসাহ দেওয়ার মতো কর্মসূচিতেও অর্থ দেওয়া হয়েছিল।
ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক সহায়তা পুনর্বিন্যাসের সময় এসব কর্মসূচির বেশির ভাগই বন্ধ হয়ে যায়।
অর্থাৎ ওয়াশিংটনের নীতিতে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে সামরিক সরকারের ওপর চাপ বাড়ানো এবং বিরোধীদের সহায়তা ছিল প্রধান লক্ষ্য, এখন সেখানে নির্দিষ্ট মার্কিন স্বার্থে সরাসরি যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মানবাধিকার প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে
তবে এই নীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মিয়ানমারের সামরিক সরকারের মানবাধিকার রেকর্ড।
সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর ২০১৬-১৭ সালের হত্যা ও বিতাড়নের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র এটিকে গণহত্যার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল।
নতুন যোগাযোগ শুরুর পরও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সহিংসতা থামেনি। ভ্যান্সের সফরের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে রাখাইনের একটি জনাকীর্ণ বাজারে বিমান হামলা চালানো হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তাদের হিসাবে এতে ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং আরও অনেকে আহত হন।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বলেছে, মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গেই তারা যোগাযোগ রাখছে। একই সঙ্গে সহিংসতা বন্ধ এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও জানাচ্ছে।
অর্থাৎ ওয়াশিংটন বলছে, সামরিক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের অর্থ অন্য পক্ষগুলোকে বাদ দেওয়া নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় হিসাব
মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন যোগাযোগকে তাই শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না।
একদিকে আছে মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্য করে সাইবার প্রতারণা বন্ধের স্বার্থ। অন্যদিকে আছে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বিরল খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা।
কিন্তু এর বিপরীতে রয়েছে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের মানবাধিকার রেকর্ড, চলমান সংঘাত এবং গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের পুরোনো সম্পর্ক।
সব মিলিয়ে মিয়ানমার নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি এখন আগের চেয়ে বেশি বাস্তব স্বার্থকেন্দ্রিক। প্রতারণা দমন, বিরল খনিজ ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ওয়াশিংটনকে সামরিক সরকারের সঙ্গে কথা বলার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
কিন্তু সেই যোগাযোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সামরিক সরকার বাস্তবে কী ধরনের সহযোগিতা করে এবং একই সঙ্গে দেশটির চলমান সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংকট কতটা কমে তার ওপর।
সূত্র : রয়টার্স








