নেপালে সংস্কৃতের নীরব পুনরুত্থান

সংগৃহীত ছবি
নেপালে সংস্কৃত ভাষা বর্তমানে এক নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দশক ধরে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা ও সামাজিক বিতর্কের কারণে ভাষাটি ধীরে ধীরে মূলধারার শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নেপাল সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশজুড়ে বিভিন্ন গুরুকুলে শিক্ষার্থীদের ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আসনসংখ্যার তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় স্পষ্ট হচ্ছে, সংস্কৃত আর শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; বরং নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও এটি হয়ে উঠছে প্রাসঙ্গিক।
এই পরিবর্তনকে কেবল অতীতের প্রতি আবেগী প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রয়োজন, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্মিলিত প্রভাব।
নেপালে সংস্কৃতের ইতিহাস মূলত প্রান্তিকীকরণের ইতিহাস। ১৯৪৭ সালের ‘জয়তু সংস্কৃতম’ আন্দোলন প্রথাগত শিক্ষাকে আধুনিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরবর্তী সময়ে জাতীয় শিক্ষা নীতির পরিবর্তনের ফলে ভাষাটির গুরুত্ব কমতে থাকে। ১৯৭১ সালের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা পরিকল্পনা সংস্কৃতকে কার্যত মূলধারার বাইরে ঠেলে দেয়। পরে মাওবাদী বিদ্রোহের সময় সংস্কৃত অধ্যয়নকে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হলে ভাষাটি আরও বিতর্কিত হয়ে ওঠে।
তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ভারতে হিন্দু পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির উত্থান এবং বৈদিক ঐতিহ্যের ওপর জোর দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে সংস্কৃতের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে। নেপালেও রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার বাড়তে দেখা যাচ্ছে। বৈদিক আচার, শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সংস্কৃতের ব্যবহার ভাষাটিকে দিয়েছে নতুন গ্রহণযোগ্যতা।
বর্তমানে সংস্কৃত শিক্ষার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ‘কর্মকাণ্ড’ বা ধর্মীয় আচার পরিচালনাভিত্তিক পেশা। নেপাল এবং বিদেশে ছড়িয়ে থাকা নেপালি প্রবাসী সমাজে পুরোহিত ও ধর্মীয় আচারবিশেষজ্ঞদের চাহিদা বেড়েছে। ফলে সংস্কৃত শিক্ষা অনেক তরুণের কাছে হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি বাস্তব পথ।
তবে গবেষকরা মনে করেন, সংস্কৃতকে শুধু আচার-অনুষ্ঠানের ভাষায় সীমাবদ্ধ রাখলে এর বিশাল জ্ঞানভান্ডার উপেক্ষিত হবে। ভাষাটির সঙ্গে দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক চিন্তার মতো বহু জ্ঞানের ক্ষেত্র জড়িত। তাই সংস্কৃত শিক্ষাকে কেবল ধর্মীয় প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণাভিত্তিক ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
সংস্কৃতের এই পুনরুত্থানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও থাইল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা যোগ, প্রাকৃতিক চিকিৎসা এবং মানসিক সুস্থতার উৎস বোঝার জন্য নেপালের সংস্কৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছেন। একই সঙ্গে দেশের দরিদ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিবারের কাছে গুরুকুলগুলো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, কারণ সেখানে বিনামূল্যে শিক্ষা, খাবার ও আবাসনের সুযোগ রয়েছে। ফলে ব্যয়বহুল বেসরকারি শিক্ষার বিকল্প হিসেবে এখন গুরুকুলমুখী হচ্ছে অনেক পরিবার।
তবে এই পুনরুত্থানকে প্রকৃত পুনর্জাগরণে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। নেপাল সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ এখনো অত্যন্ত কম, যা গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্য দূর করাও জরুরি। এখনো বহু এলাকায় দলিত ও আদিবাসী শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় শিক্ষা ও আচারভিত্তিক প্রশিক্ষণে সমান সুযোগ পান না। জাতপাত বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সংস্কৃত শিক্ষার প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ থাকলে প্রকৃত পুনর্জাগরণ সম্ভব নয়।
সংস্কৃতকে টিকিয়ে রাখতে হলে এটিকে এমন একটি উন্মুক্ত ও জীবন্ত বৌদ্ধিক ঐতিহ্যে পরিণত করতে হবে, যেখানে সমাজের সব শ্রেণির মানুষ সমানভাবে অংশ নিতে পারে। তা না হলে এই পুনরুত্থান কেবল আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় চর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে এবং একটি বড় সম্ভাবনা হারিয়ে যাবে।
কাঠমাণ্ডু পোস্টের সম্পাদকীয় থেকে অনূদিত




