বাংলাদেশসহ জনবহুল দেশগুলো কেন ফুটবলের বিশ্বমঞ্চের বাইরে?

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় অনেক সমর্থক আর্জেন্টিনার মতো দেশকে নিজেদের দল বানিয়ে নিয়েছেন। ছবি: বিবিসি
বিশ্বকাপ এলেই ফুটবল উন্মাদনা চরমে ওঠে বাংলাদেশে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা অন্য প্রিয় দলের জার্সি গায়ে দিয়ে খেলা দেখেন লাখো মানুষ, মেতে ওঠেন আনন্দ-উল্লাসে।
কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসের মধ্যেও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। সেটি হলো— এত ফুটবলপ্রেমী থাকা সত্ত্বেও কেন এখনো বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি বাংলাদেশ?
শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত, পাকিস্তান, চীন ও ইথিওপিয়ার মতো জনবহুল দেশগুলোর অবস্থাও একই। বিশ্বের ১০টি সর্বাধিক জনবহুল দেশের মধ্যে আটটিই জায়গা করে নিতে পারেনি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে। অথচ এসব দেশেই রয়েছে কোটি কোটি ফুটবলভক্ত।
গত ১৭ জুন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলটি করেন আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার গোলরক্ষককে পরাস্ত করে তার দুর্দান্ত গোলের পর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে দর্শকরা।
তবে সেখানে আর্জেন্টাইন ছিলেন না একজনও। সাদা-আকাশি রঙের আর্জেন্টিনার বিখ্যাত জার্সি গায়ে দিয়ে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে উল্লাস করা হাজারো মানুষ ছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমী। ঢাকা শহরের বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে আয়োজিত বড় বড় ওয়াচ পার্টিতে এমন দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন শহরেও আয়োজন হয়েছে একই রকম আবেগঘন ফুটবল উৎসবের।
নিজেদের দেশ বারবার বিশ্বকাপে খেলতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব দেশের অনেক সমর্থক নিজেদের দল হিসেবে গ্রহণ করেছেন মেসি ও তার দেশ আর্জেন্টিনাকেই।
বিশ্বের ১০টি সর্বাধিক জনবহুল দেশের মধ্যে বর্তমান বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে মাত্র দুটি দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল। রাশিয়া ও নাইজেরিয়া অতীতে বিশ্বকাপে খেলেছে একাধিকবার। অন্যদিকে চীন ও ইন্দোনেশিয়া বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে মাত্র একবার করে।
এখনো বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নই দেখে যাচ্ছে ভারত, বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া ও পাকিস্তান। যদিও ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল ভারত। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর এক মাসেরও কম সময় আগে নাম প্রত্যাহার করে নেয় দলটি।
বাংলাদেশের খ্যাতিমান অভিনেত্রী, লেখক ও ফুটবলপ্রেমী অদিতি করিম বিবিসিকে বলেছেন, ‘লাখো-কোটি ফুটবলপ্রেমীর একটি দেশ এতটা পিছিয়ে থাকবে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
জনসংখ্যা বড় হলেও সাফল্য নিশ্চিত নয়
তাত্ত্বিকভাবে কোনো দেশের জনসংখ্যা যত বেশি, তত বেশি সুযোগ থাকে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় পাওয়ার।
এ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ী আটটি দেশের মধ্যে সাতটি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেন, তুলনামূলকভাবে বড় জনসংখ্যার দেশ।
একমাত্র ব্যতিক্রম উরুগুয়ে।
তবে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও গবেষক স্টেফান সিজমানস্কির মতে, জনসংখ্যা সফলতার মাত্র একটি উপাদান।
বেস্টসেলার বই সকারনমিকসের সহ লেখক সিজমানস্কি বলেছেন, ‘ফুটবল অনেকটা একটি দেশের অর্থনীতির মতো। শুধু মানুষ থাকলেই হবে না। প্রয়োজন অর্থ, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।’
তার মতে, সফল ফুটবল দেশগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।
সকারনমিকস বইয়ের গবেষণায় তিনি ও সহলেখক সাইমন কুপার দেখিয়েছেন, বিশ্বকাপ জয়ের জন্য সাধারণত মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় অন্তত ১৫ হাজার মার্কিন ডলার হওয়া প্রয়োজন।
তবে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মাথাপিছু আয় এই সীমার অনেক নিচে থাকা সত্ত্বেও দেশ দুটি বিশ্বকাপ জিতেছে আটবার।
এর কারণ হিসেবে সিজমানস্কি উল্লেখ করেন, তৃতীয় একটি বিষয়, অভিজ্ঞতা ও ফুটবল জ্ঞান।
তিনি বলেছেন, ‘যেসব দেশ একশ বছর আগে থেকেই ফুটবল খেলায় আধিপত্য বিস্তার করেছিল, বিশ্বকাপও তারাই জিতেছে।’
অর্থাৎ ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমানের আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলায় অংশ নেওয়ায় তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অনেক বেশি।
এ কারণেই মাত্র ৩৫ লাখ জনসংখ্যার উরুগুয়ে ১৯৩০ ও ১৯৫০ সালে জিততে সক্ষম হয় দুটি বিশ্বকাপ।
আফ্রিকা ও এশিয়ার চ্যালেঞ্জ
ফুটবলের বিকাশ তুলনামূলকভাবে দেরিতে হয়েছে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে। ফলে তাদের এগিয়ে যেতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে বেশি।
তবে রয়েছে ব্যতিক্রমও।
স্পেন ও ফ্রান্সের কাছ থেকে ১৯৫৬ সালে স্বাধীন হওয়া মরক্কো ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছে ইতিহাস গড়ে। আর ২০০২ সালে যৌথ আয়োজক হিসেবে বিশ্বকাপের সেরা চারে উঠে একমাত্র এশীয় দেশ হিসেবে নজির স্থাপন করে দক্ষিণ কোরিয়া।
কিন্তু সিজমানস্কির মতে, ‘ইন্দোনেশিয়া, ভারত, বাংলাদেশসহ অনেক দেশ এখনো সেই ব্যবধান কমাতে পারেনি।’
ইথিওপিয়ার অবকাঠামো সংকট
কখনো বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি ইথিওপিয়া। দেশটি ১৯৬২ সালে জিতেছিল আফ্রিকান কাপ অব নেশনস। তবে ২০১৪ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে শেষ ধাপে উঠে হেরে যায় নাইজেরিয়ার কাছে।
বর্তমানে মারাত্মক বিনিয়োগ সংকটে ভুগছে দেশটির ফুটবল।
ইথিওপিয়ান প্রিমিয়ার লিগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিফলে সাইফে দেশটির সংবাদপত্র দ্য রিপোর্টারকে বলেছেন, ‘এই মৌসুমে মাত্র তিনটি অনুমোদিত স্টেডিয়ামে ৩৮০টিরও বেশি ম্যাচ আয়োজন করতে হয়েছে।’
স্টেডিয়ামের সংকটের কারণে জাতীয় দলকেও বিশ্বকাপ বাছাইয়ের হোম ম্যাচ খেলতে হয়েছে মরক্কোতে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট কি বড় বাধা?
ভারত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ক্রিকেট দেশ। তাদের আইপিএল বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগ।
ভারতের সাবেক ফুটবলার শ্যাম থাপার মতে, এর ফলে সন্তানদের ফুটবলের পরিবর্তে ক্রিকেটে উৎসাহিত করছেন অনেক অভিভাবক।
তিনি বলেছেন, ‘অভিভাবকদের বুঝতে হবে, ফুটবলেও সফল ক্যারিয়ার গড়ে ভালো আয় করা সম্ভব।’
তবে অদিতি করিম মনে করেন, ক্রিকেটকে দোষ দেওয়া ঠিক নয়।
তিনি বলেছেন, ‘অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট শক্তি হয়েও নিয়মিত বিশ্বকাপে খেলছে। তাই ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা শুধু একটি অজুহাত।’
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দেশে বিশ্বকাপে খেলার মতো প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও কাঠামো নেই।’
ঘুমন্ত দৈত্য চীন?
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে চীন অন্যতম সফল দেশ হলেও পুরুষ ফুটবলে তাদের সাফল্য খুবই সীমিত।
বেইজিংভিত্তিক ফুটবল বিশ্লেষক মার্ক ড্রেয়ারের মতে, ‘তাত্ত্বিকভাবে চীন বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরি করতে পারে। কিন্তু বড় সমস্যা হলো ফুটবল পরিচালনায় অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।’
২০০২ সালের পর চীন আর ফিরতে পারেনি বিশ্বকাপে।
যদিও ২০১০-এর দশকে বিপুল বিনিয়োগ করে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার তারকা খেলোয়াড়দের চীনা লিগে আনা হয়েছিল, তবুও হয়নি কাঙ্ক্ষিত উন্নতি।
ইন্দোনেশিয়ার ভিন্ন পথ
একবারই বিশ্বকাপে খেলেছে ইন্দোনেশিয়া। ১৯৩৮ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ নামে অংশ নিয়েছিল তারা। তখন দেশটি ছিল নেদারল্যান্ডসের উপনিবেশ।
২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে শেষ ধাপ পর্যন্ত পৌঁছায় তারা।
তবে বিবিসির ইন্দোনেশিয়া বিভাগের নিউজ এডিটর জেরোম উইরাওয়ানের মতে, এই সাফল্যের বড় কারণ ছিল ইউরোপে জন্ম নেওয়া ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দলে অন্তর্ভুক্ত করা।
তিনি বলেছেন, ‘অনেক ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার শুরুর একাদশে আট বা ৯জনই ছিলেন ইউরোপে জন্ম নেওয়া ফুটবলার।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বিদায় নেয় এশিয়ান বাছাইপর্বের গ্রুপ পর্ব থেকেই। ছয় ম্যাচে কোনো জয় পায়নি দুই দেশই।
এ ছাড়া পাকিস্তানের ফুটবল ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের কারণে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনবার দেশটিকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা।
স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে
অনেক দেশের জন্য বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন এখনো অনেক দূরের।
তবুও অদিতি করিম মনে করেন, ফুটবলের আনন্দ উপভোগ করার জন্য বিশ্বকাপে অংশ নেওয়াই একমাত্র শর্ত নয়।
তিনি বলেছেন, ‘বাস্তবতা বিবেচনায় আমার জীবদ্দশায় বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখি না। তবুও বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্তের আনন্দ উপভোগ করতে চাইবে।’
সূত্র: বিবিসি








