পানি যখন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার
তৃষ্ণায় কাতর গাজা

রাফাহর আল-মাওয়াসিতে পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা ফিলিস্তিনিদের
দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি শিবিরের শরণার্থী নাওয়াফ আল-আখরাস। প্রতিদিন তার সকাল শুরু হয় এক কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তাঁবু থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরের পানি ভরার স্টেশন থেকে বোতল ও জেরিক্যান বহন করেই দিন শুরু করেন।
প্রতিদিনের মতো স্টেশনে পৌঁছেই বাবা-ছেলের চোখে পড়ে হাজার হাজার মানুষের লাইন। সবাই নিজেদের পালার অপেক্ষায় প্রখর রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে।
সাত সন্তানের বাবা নাওয়াফ। দুই বছর আগে রাফাহ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আল-মাওয়াসিতে আশ্রয় নিয়েছেন। জানান, পানির জন্য প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টার বা কখনো কখনো আরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। এটি তার পরিবার ও বাস্তুচ্যুত অন্য ফিলিস্তিনিদের জন্য অসহনীয় যন্ত্রণার।
নওয়াফ জানান, পুরো দিন ছেলের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে পানি ভরতেই কেটে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। শুধু পানি পানের জন্যই প্রতিদিনের এই কষ্ট।
গাজার আল-মাওয়াসিতে পানি না পেয়ে গত শনিবার বিক্ষোভ করেছেন অনেকে।
গতকাল মঙ্গলবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি গাজার বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে, আল-মাওয়াসিতে এই সংকট আরও বেশি। আগে ‘ইটা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান রাফাহ থেকে বেইত হানুন পর্যন্ত বাস্তুচ্যুতদের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করত। কিন্তু তহবিলের অভাবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
নাওয়াফ জানান, আগে পানিবোঝাই ট্রাক প্রায় প্রতিদিনই তাদের তাঁবুর কাছাকাছি আসত। এতে তার পানি সংগ্রহ ও বহনের বোঝা অনেক কমেছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে এই ট্রাকগুলো বন্ধ। এতে পানি পাওয়ার সংগ্রাম দ্বিগুণ হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রচণ্ড ভিড় ও প্রতিযোগিতার কারণে দিনে মাত্র দুটি ছোট জেরিক্যান পানি সংগ্রহ করতে পারেন, যা দিয়ে পরিবারের দৈনিক পানির চাহিদা পূরণ হয় না।
নাওয়াফ আলজাজিরাকে বলছিলেন, ‘আগে ক্ষুধায় মরেছি, এখন আমাদের তৃষ্ণায় মৃত্যুর পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য এটুকুই অবশিষ্ট।’
গ্রীষ্মের আগমন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। ‘তাঁবুর ভেতর গরমের কষ্ট অবর্ণনীয়। মনে হয় যেন চুলায় ভাজা হচ্ছে। আমাদের রক্ষা করার মতো কোনো ছাদ নেই। এখন যদি পানির সংকট আরও বাড়ে, তা হবে সম্পূর্ণ বিপর্যয়’, যোগ করেন তিনি।
পানির দাবিতে বিক্ষোভ
তীব্র পানি সংকটের কারণে আল-মাওয়াসির বাসিন্দারা বিক্ষোভে নেমেছেন। গত শনিবার শত শত বাস্তুচ্যুত মানুষ পানি সংকট নিরসনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
ইসরায়েল গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণ প্রবেশে বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখায় ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির মধ্যেও পানীয় জলের সংকট নিরসনের দাবি জানান তারা।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে বলেন, হাজার হাজার শিশু ও বৃদ্ধ মানুষের জীবন রক্ষায় অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা জোর দিয়ে বললেন, নিরাপদ পানি মৌলিক মানবাধিকার।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আল-মাওয়াসির বাসিন্দা সালাহ আল-কাউশ আল-জাজিরাকে জানান, আগে যেসব পানির ট্রাক সীমিত সরবরাহ দিত, সেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পানি সংগ্রহ এখন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
১৩ সদস্যের পরিবার নিয়ে বসবাসকারী সালাহ জানাচ্ছিলেন, উচ্চ লবণাক্ত ‘ইউটিলিটি পানি’ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি পানের জন্য নিরাপদ নয়। প্রতিদিন শিশুদের অসুস্থ হওয়ার খবর পাচ্ছেন। নিজের চার সন্তান নিয়েও উদ্বিগ্ন বলে জানান।
ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো ও বাড়তে থাকা সংকট
পশ্চিম খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি একসময় ছিল জনবিরল কৃষি এলাকা। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালে এটি বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী এটিকে তথাকথিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণার পর শত সহস্র বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নেয়। কিন্তু পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব ও হামলার মধ্যেও মানুষকে গাদাগাদি করে তাঁবুতে বসবাস করতে হচ্ছে।
জনসংখ্যার এই হঠাৎ বৃদ্ধি পানির সংকটকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে। জাতিসংঘ এই পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে উল্লেখ করেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গাজার অধিকাংশ মানুষ পর্যাপ্ত খাওয়ার পানি পাচ্ছে না। এই সংকট শুধু অনুমেয়ই ছিল না, বরং আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল।
জাতিসংঘ কর্মকর্তারা জানান, মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম পানি সরবরাহ হওয়ায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে।
এই সংকটের পেছনে রয়েছে পানি অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস, জ্বালানি সংকট এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা।
পানি নিয়ে ঘরে ফিরছেন দুজন ফিলিস্তিনি।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গাজার অনেক এলাকায় প্রায় ৬৫ শতাংশ পানি কূপ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে পানি উৎপাদন ও সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে মাথাপিছু পানির প্রাপ্যতা ৯৭ শতাংশ কমে গেছে। আর বর্তমানে মোট পানির সরবরাহ যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে।
তৃষ্ণাকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার
মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, এই সংকট এখন আর শুধু যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি পদ্ধতিগত রূপ নিয়েছে।
ইউরো-মেড মানবাধিকার মনিটরের মতে, বেসামরিক মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির অভাব এখন জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, এই পরিস্থিতি শুধু অবকাঠামো ধ্বংস নয়, বরং জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করা, রক্ষণাবেক্ষণে বাধা দেওয়া এবং পানি সরবরাহ সীমিত করার মতো নানা পদক্ষেপের ফল।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইসরায়েলের অবরোধ ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে গাজার প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ন্যূনতম পর্যাপ্ত পানীয় থেকেও বঞ্চিত তারা।
তাদের মতে, গাজায় পিপাসাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বাস্তবে পরিণত হয়েছে। পানি ও খাদ্য বন্ধ করে দেওয়া একটি নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী অস্ত্র।
এই বাস্তবতা এখন প্রতিদিনের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে। সীমিত পানির উৎস পেতে মানুষকে দূর-দূরান্তে হাঁটতে হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এমনকি কখনো কখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়েও পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
ক্রমাগত সরবরাহ বিঘ্ন ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পানি এখন আর মৌলিক সেবা নয়। এটি হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার ওপর নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার।


