হ্যারি-মেগানের পাহারার বিল মেটাবেন কারা?

প্রিন্স হ্যারি ও স্ত্রী মেগান। ছবি: সংগৃহীত
ছয় বছরের ‘মেগজিট’ অধ্যায় পেরিয়ে স্ত্রী মেগান ও দুই সন্তানকে নিয়ে ব্রিটেনে ফিরছেন প্রিন্স হ্যারি। কিন্তু ঘরে ফেরার আগেই সামনে হাজির পুরনো এক প্রশ্ন: তাদের পাহারা দেবে কে, আর সেই বিপুল খরচই বা মেটাবেন কারা? হ্যারি-মেগানকে পূর্ণমাত্রার নিরাপত্তা দেওয়া হলে ব্যয় প্রায় ৫০ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে হিসাব দেওয়া হয়েছে। যদিও এটি সরকারি হিসাব নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ব্রিটিশ করদাতাদের অর্থে তাঁদের ফের সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
চলতি মাসের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্রিটেনে ফিরছেন ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্স। লন্ডনের বাইরে একটি ব্যক্তিগত, রাজপরিবারের বাইরের বাসভবনে থাকবেন তাঁরা। সাত বছরের প্রিন্স আর্চি এবং পাঁচ বছরের প্রিন্সেস লিলিবেটও সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ স্কুলে পড়াশোনা শুরু করবে। তবে ২০২০ সালে রাজকীয় দায়িত্ব ছাড়ার সময় যে ব্যবস্থা হয়েছিল, সেটিই বহাল থাকছে। হ্যারি ও মেগান ‘কর্মরত রাজপরিবারের সদস্য’ হচ্ছেন না।
আর সেখানেই নিরাপত্তা নিয়ে জটিলতা। কর্মরত রাজপরিবারের সদস্যের দায়িত্ব ছাড়ার পর ২০২০ সালের মার্চে হ্যারি-মেগানের স্বয়ংক্রিয়, করদাতাদের অর্থে পরিচালিত পূর্ণ পুলিশি নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হয়েছিল। পরিবর্তে হ্যারিকে দেওয়া হয় পরিস্থিতি ও সফরের প্রকৃতি অনুযায়ী আলাদা করে নিরাপত্তা নির্ধারণের ব্যবস্থা। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়েও ২০২৫ সালের মে মাসে আপিলে হেরে যান হ্যারি। আদালত বলেছিল, তাঁর অবস্থান বদলে যাওয়ার পর নিরাপত্তা নিয়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা বেআইনি ছিল না।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হয়নি। গত ডিসেম্বরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা-ঝুঁকির নতুন করে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন চান হ্যারি। এরপর রাজপরিবার ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নির্ধারণকারী রয়্যাল ও ভিআইপি এক্সিকিউটিভ কমিটি (র্যাভেক) তাঁর ঝুঁকি নতুন করে পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রায় নয় মাস পেরিয়ে গেলেও সেই মূল্যায়ন এখনও শেষ হয়নি। দ্য টাইমস জানিয়েছে, নিরাপত্তা পর্যালোচনার বহু আবেদন জমে থাকা এবং ব্রিটেনের নয়জন জীবিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাসহ অন্য দায়িত্বের চাপেও প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হয়েছে।
হ্যারি-মেগানের ব্রিটেনে ফেরার সিদ্ধান্তের পর এখন সেই মূল্যায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ অল্প দিনের সফর আর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্রিটেনে বসবাস—নিরাপত্তার হিসাবে এক বিষয় নয়। নতুন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের ঝুঁকি আবার যাচাই করতে হতে পারে। তবে এ মুহূর্তে তাঁদের সার্বক্ষণিক করদাতার অর্থে সশস্ত্র পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে না, এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও এখনও ঘোষণা হয়নি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এ নিয়ে প্রশ্নের মুখে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। নিরাপত্তার ব্যয় কে বহন করবে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টিকে হ্যারি-মেগানের ‘ব্যক্তিগত বিষয়’ বলে উল্লেখ করেন এবং তাঁদের ব্রিটেনে ফেরার জন্য শুভেচ্ছা জানান। তবে হ্যারি-মেগানের নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নেন না; র্যাভেকের ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নির্ধারিত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নির্দিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তাব্যবস্থার বিস্তারিত প্রকাশ না করার দীর্ঘদিনের নীতি বহাল রেখেছে।
এখানে আর একটি অদ্ভুত জট রয়েছে। হ্যারি অতীতে বলেছিলেন, ব্রিটিশ করদাতাদের ওপর বোঝা চাপাতে চান না; প্রয়োজন হলে নিজের অর্থে পুলিশি নিরাপত্তার খরচ দিতে প্রস্তুত তিনি। কিন্তু ব্রিটিশ আইনি ব্যবস্থায় বিষয়টি এত সহজ নয়। বিশেষ প্রশিক্ষিত সশস্ত্র পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত অর্থের বিনিময়ে ‘কিনে নেওয়া’ যাবে না—এই নীতির বিরুদ্ধে হ্যারির করা পৃথক আইনি আবেদনও ২০২৩ সালে খারিজ হয়। আদালতের যুক্তি ছিল, এ ধরনের বিশেষজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা সীমিত এবং অর্থের বিনিময়ে তাঁদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া জনস্বার্থের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
তাহলে নিজের নিরাপত্তারক্ষী রাখলেই সমস্যা কোথায়? যুক্তরাষ্ট্রে হ্যারি-মেগান নিজেদের অর্থেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দল চালান। কিন্তু ব্রিটেনে বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতে পারেন না এবং পুলিশের মতো গোয়েন্দা তথ্য ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থায় সরাসরি প্রবেশাধিকারও তাঁদের নেই। হ্যারির যুক্তি বরাবরই, তাঁর পরিবারের ক্ষেত্রে এই ব্যবধানটাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
গত জুলাইয়ে সেই দাবিকে আরও জোরালো করে হ্যারির নিজের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের তৈরি একটি গোপন ঝুঁকি-প্রতিবেদন। আইটিভি নিউজের দেখা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, হ্যারিকে ঘিরে অন্তত ছয়টি সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রের তথ্য পাওয়া গেছে, যার পাঁচটির উৎস ব্রিটেনে। আল-কায়েদার একটি নথিতেও তাঁকে হত্যার আহ্বানের কথা রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজপরিবারকে লক্ষ্য করা প্রায় ৫০০ সম্ভাব্য অনুসরণকারীর বিষয়ে মেট্রোপলিটন পুলিশ অবগত এবং তাঁদের একটি অংশ হ্যারি, মেগান ও সন্তানদের জন্য হুমকি তৈরি করেছে। তবে এটি হ্যারির নিয়োগ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন; র্যাভেকের সরকারি সিদ্ধান্ত নয়।
নিরাপত্তা নিয়ে হ্যারির উদ্বেগ এতটাই ছিল যে ২০২৫ সালে আইনি লড়াই হারার পর তিনি বলেছিলেন, এমন পরিস্থিতিতে স্ত্রী ও সন্তানদের ব্রিটেনে নিয়ে আসার কথা তিনি ভাবতে পারছেন না। অথচ এক বছরেরও কিছু বেশি সময়ের মধ্যে সেই পরিবারই এখন ব্রিটেনে দীর্ঘ সময়ের জন্য বসবাস করতে চলেছে। গত মাসে মেগান, আর্চি ও লিলিবেটকে নিয়ে হ্যারি ব্রিটেনেও এসেছিলেন; রাজা তৃতীয় চার্লস ২০২২ সালের পর প্রথমবার দুই নাতি-নাতনির সঙ্গে দেখা করেন।
ফলে হ্যারি-মেগানের ‘ঘরে ফেরা’ এখন আর শুধু রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ব্রিটিশ করদাতার অর্থ, রাজকীয় মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার নিয়ে পুরনো বিতর্ক। যদি র্যাভেক মনে করে হ্যারি ও তাঁর পরিবারের ঝুঁকি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দেওয়ার মতো, তবে পুলিশি নিরাপত্তার পথ খুলতে পারে; না হলে নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবস্থাতেই চলতে হবে সাসেক্সদের।
আর তাই ছয় বছর পরে ঠিকানা বদলের সিদ্ধান্ত হয়ে গেলেও একটি প্রশ্ন এখনও ঝুলে, ব্রিটেনে হ্যারি-মেগানের নতুন জীবনের পাহারার সেই সম্ভাব্য ৫০ লাখ পাউন্ডের বিল শেষ পর্যন্ত যাবে কার ঘরে?








