আগামীর সময়

ধ্বংসস্তূপেই বাঁচার লড়াই

ধ্বংসাবশেষ, কাদা আর চুল দিয়েই ঘর বানাচ্ছেন গাজাবাসী

ধ্বংসাবশেষ, কাদা আর চুল দিয়েই ঘর বানাচ্ছেন গাজাবাসী

মোহাম্মদ আল-জাদবা গাজা শহরে তার বাড়ি পুনর্নির্মাণের জন্য হাতের কাছে যা পাচ্ছেন তাই ব্যবহার করছেন। ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের হামলায় ৪ তলা বাড়িটা এখন মাটির সাথে মিশে গেছে। চারদিকে শুধু ইট-পাথরের স্তূপ। কিন্তু পৈত্রিক ভিটা ছেড়ে কোথায় যাবেন ৩১ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল জাদবা? গত অক্টোবর থেকে ১০ জনের পরিবার নিয়ে তাবুতেই থাকছিলেন। কিন্তু বৃষ্টি আর শীতের দাপটে তাবু যখন টিকছে না, তখন বাধ্য হয়েই ধ্বংসস্তূপের পাথর আর কাদা দিয়ে নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই বানাচ্ছেন তিনি।

​ঘর বানাতে গিয়ে জাদবা পড়লেন মহাবিপদে। কাদা দিয়ে দেয়াল গাঁথতে খড় লাগে, যাতে কাদাটা শক্ত হয়। কিন্তু গাজায় খড় কোথায়? ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞায় কোনো নির্মাণসামগ্রীই ঢুকতে পারছে না। বুদ্ধি করে জাদবা নাপিতের দোকান থেকে মানুষের চুল সংগ্রহ শুরু করলেন। কাদার সাথে চুল মিশিয়ে তিনি তৈরি করছেন মজবুত দেয়াল। জাদবা জানান, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম একটা রুম আর বাথরুম বানাবো, এখন তো দেখি পুরো ঘরই হয়ে যাচ্ছে।’


​জাদবার এই কষ্টের ঘরের পেছনে আছে এক করুণ ইতিহাস। মাত্র এক সপ্তাহ আগে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে তার মা আহত হয়েছেন। তাবু ফুঁড়ে গুলি ঢুকেছিল ভেতরে। কয়েক মাস আগে তাদের এক প্রতিবেশীও ঘুমের ঘোরে গুলিতে মারা যান। জাদবা বলেছেন, ‘তাবু আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারে না। অন্তত এই দেয়ালগুলো আমাদের কিছুটা হলেও রক্ষা করবে।’


​জাতিসংঘের মতে, গাজাকে আগের অবস্থায় ফেরাতে অন্তত ৭০ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে। কিন্তু জাদবা বলছেন অন্য কথা, ‘গাজার খবর যারা রাখেন তারা জানেন, পুনর্গঠন এখন একটা মিথ্যা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু না। ধ্বংসস্তূপ সরাতেই যদি পাঁচ বছর লাগে, তবে ঘরবাড়ি কবে হবে?’


​শুধু জাদবা নন, খান ইউনুসের ৫৫ বছর বয়সী আবদেল নাসের আল জালৌসিও ফিরেছেন তার আধা-ভাঙা বাড়িতে। দরজা-জানালা বলতে কিছু নেই। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (UNDP) সহায়তায় কোনোমতে পলিথিন আর কাঠ দিয়ে দরজা-জানালা তালি দেওয়া হয়েছে। নাসের জানান, ‘এখন আমার ঘরের দরজা পলিথিনের। বৃষ্টি এলে ঘর ভেসে যায়। এটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, শুধু টিকে থাকার চেষ্টা।’


​গাজার ৯২ শতাংশ বাড়িঘর এখন ক্ষতিগ্রস্ত। রড, সিমেন্ট বা ভারি যন্ত্রপাতি ঢোকার অনুমতি দিচ্ছে না ইসরায়েল। ফলে সাধারণ মানুষ কাদা, চুল আর পলিথিন দিয়ে  তালি মেরে ঘর ঠিক করার চেষ্টা করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক সমাধান আর নির্মাণসামগ্রী আসার অনুমতি না পেলে গাজাবাসীর এই দুর্ভোগ শেষ হওয়ার নয়।

​যুগ যুগ ধরে চলা এই মানবিক সংকটের অবসান কবে?

সূত্রঃ আল জাজিরা

    শেয়ার করুন: