পাঁচ বছর পর ফিরল নন্দীগ্রামের ‘পা-কাণ্ড’
- পুরনো চিকিৎসা-নথি ঘিরে শুভেন্দু-মমতা সংঘাত

ফাইল ছবি
পাঁচ বছর আগের নন্দীগ্রামের সেই বিতর্কিত পায়ের চোট আবারও সামনে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির আলোচনায়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে আঘাত লাগার ঘটনা নিয়ে এবার পুরনো চিকিৎসা নথি প্রকাশ্যে এনে প্রশ্ন তুলেছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তার দাবি, ১১ মার্চ ২০২১- এর চিকিৎসা রিপোর্টে পায়ে হাড় ভাঙা বা স্থানচ্যুত হওয়ার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচনী বিধি উঠে গেলে নতুন করে তদন্তের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনাটি ঘটেছিল ১০ মার্চ ২০২১। নন্দীগ্রামের বিরুলিয়ার রেয়াপাড়ায় প্রচারে গিয়ে মমতা অভিযোগ করেছিলেন, ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন তাকে ধাক্কা দেওয়ায় গাড়ির দরজায় তার পা আটকে যায়। তার পায়ে ও কোমরে চোট লাগে বলে তিনি জানিয়েছিলেন। পরে তাকে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন বাঙুর ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসে তার এক্স রে করা হয়েছিল। চিকিৎসার পর বাঁ পায়ে প্লাস্টার নিয়ে হুইলচেয়ারে বসেই নির্বাচনী প্রচারে ফিরেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ।
এবার শুভেন্দু যে নথি প্রকাশ করেছেন, সেখানে বাঙুর ইনস্টিটিউটের রেডিয়ো- ডায়াগনসিস বিভাগের ১১ মার্চের রিপোর্টে ‘ফ্র্যাকচার বা ডিসলোকেশনের প্রমাণ নেই’ বলে উল্লেখ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। আরও একটি নথিতে ‘কোনও হাড়ের চোট দেখা যায়নি’ লেখা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, এই নথি ২০২১ সালের ঘটনার সঙ্গে তার তোলা প্রশ্নের ভিত্তি। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের ফল আগামী ৯ অক্টোবর প্রকাশের পর তিনি বিষয়টি নিয়ে আরও তথ্য সামনে আনার কথা বলেছেন।
তবে শুভেন্দু অধিকারীর ব্যাখ্যা মেনে নেয়নি তৃণমূল। দলের বিশিষ্ট নেতা কুণাল ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন, পা ভাঙেনি মানেই যে গুরুতর চোট ছিল না, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় কি না। তাঁর বক্তব্য, ফ্র্যাকচার না হলেও আঘাতের কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে পায়ে ব্যান্ডেজ বা অন্য কোনও চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে।
প্রকাশ করা নথির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। কুণাল ঘোষ বলেন, "মমতাদির পা-এর জখম নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনীতি দুর্ভাগ্যজনক ও রুচিহীন। কারুর ব্যক্তিগত জখম নিয়ে কুৎসা ও অপপ্রচার আপত্তিকর। মমতাদির পায়ের জখম ছিল এবং সংশ্লিষ্ট ডাক্তাররা তার সাক্ষী। যে সংস্থায় যারা চিকিৎসা করেছিলেন, তাঁরা জানেন। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন হাতে আছে বলে যে কোনো বিকৃত প্রচার করা ঠিক নয়। শুভেন্দুর বোঝা উচিত, ভাঙলে তবু জোড়ে বা সারে। কিন্তু নরম টিস্যু, মাসল আর হাড়ের উপর গভীর আঘাত সারা কঠিন। এখনও মমতাদির পায়ে ফোলা অংশ স্বাভাবিক নয়। আমি যতদূর জানি, পুরো সারেনি। তা নিয়ে উপনির্বাচনের আগে এই কুৎসিত রাজনীতি আপত্তিকর, নিন্দনীয়। মমতাদিকেই যে বিজেপি আসল প্রতিপক্ষ ভাবে এবং তাদের শয়নে স্বপনে জাগরণে মমতাদিকেই দেখে, সেটা আবার প্রমাণিত। তাছাড়া চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠান কখনও কারুর ব্যক্তিগত চিকিৎসাতথ্য বাইরে আনার রীতি নেই, সরকার সেটাও যেন মনে রাখে। রাজনীতিকে আর কত নিচে নামাবে এরা? মমতাদির পায়ের সেই ভয়ংকর আঘাত নিয়ে নোংরামি চূড়ান্ত আপত্তিকর।"
তৃণমূলের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে যে , ২০২১ সালের ওই ঘটনার সময় মমতার বাঁ হাঁটুতে রক্তাক্ত চোটের ছবিও প্রকাশ্যে এসেছিল। চিকিৎসার নথি প্রকাশ করা নিয়েও দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম নির্বাচনে মমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী । শেষ পর্যন্ত অল্প ব্যবধানে ওই আসনে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। পাঁচ বছর পর সেই নন্দীগ্রামেই উপনির্বাচনের আগে পুরনো চোটের প্রসঙ্গ ফের সামনে এল। তবে চিকিৎসার নথি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি তদন্ত বা নথির পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের ওপরই নির্ভর করবে।



