মোদির ভারতে ইন্দিরার জরুরি অবস্থার ছায়া
- লেবার পার্টির নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে দিল্লির রাস্তায় নেমেছেন আন্দোলনকারীরা। গতকাল বিক্ষোভ চলাকালে আটক হন একাধিক বিক্ষোভকারী। তাদের ওঠানো হয় পুলিশ বাসে। সেই বাস থামানোর চেষ্টায় পথ আটকান এক তরুণী -রয়টার্স
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ভারতের সদ্য ভূমিষ্ঠ রাজনৈতিক দল। দুইয়ে দুইয়ে চার মাসও হয়নি বয়স! ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের ভাষায় আরশোলা; সমাজের পরজীবী। ব্যঙ্গাত্মক দলটিকে ব্যঙ্গ করে তেলাপোকা নামেই ডাকে বিরোধীরা। একই সুর ছিল দেশটির সুশীল সমাজ থেকে সামাজিক মাধ্যমেও। আত্মপ্রকাশের পর থেকে মুখে মুখে উপহাসের পাত্র হয়ে ওঠা দলটিই এখন ‘আতঙ্ক’ হয়ে উঠেছে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের! নাম শুনতেই যেন কেঁপে উঠছে মোদি মসনদের ভিত। যার হুংকার ঠেকাতে শাসন কাঠামোর ‘শেষ অস্ত্র’— স্বৈরাচারী বাণ ছুড়ছেন বিশ্বের বৃহৎ গণতন্ত্রের কাণ্ডারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিমান থেকে আটকের সময় গতকাল শনিবার সে অভিযোগই করলেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। বললেন, জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধীও এত স্বৈরাচার ছিলেন না।
গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা করা অপরাধ নয়, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদও নয়। অথচ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে অভিযোগের তদন্তের দাবিতে সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে গতকাল দিল্লিতে যে ব্যাপক ধরপাকড় ও নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখা গেল, তাতে নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ ভারতেই। যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর আগেই বহু বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। দি হিন্দুর খবর অনুযায়ী, এক দিনেই পাঁচ হাজারের বেশি! চোখের পলকে বড় বড় নেতা সব ‘কারাগারে’! ঠিক যেন ইন্দিরা গান্ধীর সেই জরুরি অবস্থার দিনগুলো। মাঝ রাতেই জয়প্রকাশ নারায়ণ, মোরারজি দেশাই, অটল বিহারি বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদভানি এবং চরণ সিংয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বন্দি করা হয়।
দলের শীর্ষ নেতাদেরও দিল্লিতে বিমান অবতরণের পর আটক করা হয়েছিল নিজ নিজ বাসস্থান থেকে। যন্তর মন্তর বিক্ষোভ ঠেকাতে একই পথে হাঁটল মোদি সরকারও। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ আন্দোলনের প্রধান মুখ, জেন-জি শিরোমণি অভিজিৎ দীপকেকে আটক করে বিমান থেকে। মুম্বাই থেকে দিল্লিতে আসা বিমানটি সবে অবতরণ করেছে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ঠিক তখনই। যাত্রীবাহী বিমানটির ভেতরে ঢুকে তাকে আটক করে পুলিশ। ওই সময় দীপকে বলছিলেন, ‘ইন্দিরা গান্ধীও এমন করেননি। এটা একনায়কতন্ত্র— আমাদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে। আমরা গ্রেপ্তার হতেই এসেছি, আপনাদের ভয় পাই না।’ দীপকের সঙ্গে দলের দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও আটক করা হয় তখন। আটক বিক্ষোভকারীদের পুলিশ ভ্যানে তুলে ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়ার খবরও সামনে আসে।
দিল্লির ধরপাকড়কে ঘিরে ১৯৭৫ সালের সেই জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন অন্য বিরোধী নেতারাও। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিস্থিতিকে জরুরি অবস্থার চেয়েও ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেছেন। যন্তর মন্তরে যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি দক্ষিণ অ্যাভিনিউ এলাকায় দলের সাংসদদের সঙ্গে ধর্নায় বসেন। পরে তাকে ও তৃণমূলের একাধিক নেতাকে আটক করা হয় বলে খবর। সোমবার ইন্ডিয়া জোটের প্রস্তাবিত মিছিলে যোগ দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মমতা।
আম আদমি পার্টির আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়ালও সিজেপি নেতাদের আটকের ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করেছেন। তার অভিযোগ, আটক করে তরুণদের প্রতিবাদ থামানো যাবে না। কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নও দিল্লিকে কার্যত ‘মুক্ত কারাগার’-এ পরিণত করার অভিযোগ তুলেছেন। সিজেপির মূল অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটারদের নাম বাদ পড়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। দলের দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত। এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নথি, নাম বাদ দেওয়ার কারণ এবং আপত্তি জানানোর সুযোগ খতিয়ে দেখা জরুরি। অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি তথ্যভিত্তিক তদন্ত ছাড়া অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়াও যথেষ্ট নয়।
নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। ভোটার তালিকা নিয়ে আস্থার সংকট সৃষ্টি হলে তার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নিষ্পত্তি জরুরি। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলার যুক্তি তুলে ধরে বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার বদলে আটক-সংক্রান্ত তথ্য ও আইনি কারণ স্পষ্ট করা হোক।



