ফ্রান্সে স্কুলের আন্দোলন কীভাবে রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিল?

ছবি: রয়টার্স
ফ্রান্সজুড়ে এখন বিক্ষোভ চলছে। শুরু হয়েছিল স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ দিয়ে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন শ্রমিক, সরকারি কর্মী, ট্রেড ইউনিয়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষ। সব মিলিয়ে এটি এখন দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। যা দেশটিকে ফেলে দিয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে।
শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বেশির ভাগ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে কিছু মানুষ ভবন ও দোকানে হামলা, লুটপাট এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে।
পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে এবং বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান চালিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু বলেছেন, ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৫০ জন পুলিশ সদস্য। যদিও সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, গ্রেপ্তারের সংখ্যা ২৪০০ ছাড়িয়েছে।
এই সংঘর্ষের পেছনে শুধু স্কুলের সমস্যা নেই। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, সরকারি সেবার অবনতি, পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ এবং সরকার এসব সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট করছে না—এমন অভিযোগও আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে।
স্কুল থেকে কীভাবে জাতীয় আন্দোলন
আন্দোলন শুরু হয় গত মাসে প্যারিসের শ্রমজীবী মানুষের অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি উচ্চবিদ্যালয়ে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষক সংকট ও স্কুলের খারাপ অবকাঠামোর প্রতিবাদ করে।
পরে স্কুল অবরোধ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বোর্দো, রেন, নঁত, লিয়ঁ, লিল ও মার্সেইয়ের মতো শহরে।
শনিবারের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য এবং ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরাও যোগ দেন।
এডিনবরার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক ইতিহাসের অধ্যাপক এমিল শাবাল বলেছেন, বর্তমান বিক্ষোভ কয়েক বছর ধরে চলা ধারাবাহিক আন্দোলনের স্বাভাবিক ফল। এর মধ্যে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনও রয়েছে।
ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের পেছনে ছিল মানুষের আর্থিক চাপ এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ। সেই আন্দোলনে সরকারি সেবা উন্নত করার দাবিও উঠেছিল।
এখন শিক্ষার্থীদের স্কুলসংক্রান্ত দাবি এবং সাধারণ মানুষের বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবিগুলো একসঙ্গে মিশে গেছে। শাবালের মতে, ফরাসি সরকারের জন্য এটি সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি।
শিক্ষার্থীরা কী চাইছে
শিক্ষার্থীদের মূল দাবি স্কুলের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। ফ্রান্সের ‘লিসে’ বা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা পড়ে।
তারা ছোট আকারের ক্লাসরুম, পর্যাপ্ত শিক্ষক, ভালো ভবন এবং কম ক্লান্তিকর সময়সূচি চায়।
তবে তাদের ক্ষোভ শুধু স্কুলে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্র তরুণদের জন্য ভালো শিক্ষা ও ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি করতে পারছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
স্কুলের শিক্ষক ও অন্যান্য সরকারি কর্মীদের জন্য বিষয়টি আরও বড়। তাদের দাবি বেতন, সরকারি সেবা চালানোর অর্থ এবং কাজের পরিবেশ নিয়েও।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি খাতে দেশব্যাপী ধর্মঘট। সরকারের বাজেট পরিকল্পনার বিরোধিতায় এই ধর্মঘট চলছে।
বাজেট নিয়ে এত ক্ষোভ কেন
২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে ৫৪ বিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৬০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় কমানো ও করসংক্রান্ত পদক্ষেপ রয়েছে।
সরকার বলছে, ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি কমাতে এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এর মধ্যে সরকারি কর্মীদের মূল বেতন নির্ধারণে ব্যবহৃত বেতন কাঠামো স্থগিত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নগুলোর অভিযোগ, এটি হলে টানা চতুর্থ বছর সরকারি কর্মীদের বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে।
সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক দোনাতেল্লা দেলা পোর্তা বলেছেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বৈষম্য, সরকারি বিনিয়োগ কমানো এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনকে উৎসাহিত করছে।
তার মতে, বিক্ষোভকারীরা সামরিকীকরণের বদলে সামাজিক কল্যাণে বেশি ব্যয় চান। তার ভাষায়, ‘তারা যুদ্ধ করতে চায় না; তারা ভিন্ন একটি ভবিষ্যৎ চায়।’
তিনি গাজা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গেও বর্তমান বিক্ষোভের যোগসূত্র দেখেছেন। বিভিন্ন বিক্ষোভে ফিলিস্তিনি পতাকাও দেখা গেছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া কী
সরকারের তাৎক্ষণিক নজর এখন মূলত আইনশৃঙ্খলার দিকে।
প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ বলেছেন, যারা সহিংসতায় জড়িত, তাদের বিচার ও শাস্তি দেওয়া হবে।
এই বক্তব্যের সময়ই লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলের বড় অংশ আগুনে পুড়ে যায়। দেশের অন্য এলাকাতেও সরকারি ভবন ও দোকানে হামলা হয়েছে।
তবে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিরা পুরো আন্দোলনের তুলনায় খুবই ছোট একটি অংশ। বামপন্থী ফ্রান্স আনবোড দলের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ অভিযোগ করেছেন, সরকার শিক্ষার্থীদের দমন করছে এবং পরিস্থিতি আরও সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এখানেই রাজনৈতিক বিতর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকার কি শুধু নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে আন্দোলনটিকে দেখবে, নাকি যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে আন্দোলন তৈরি হয়েছে, সেগুলোর সমাধান করবে?
ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংকট কতটা গভীর
বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটি শুধু বাজেটের কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়। এর পেছনে আরও বড় রাজনৈতিক সংকট রয়েছে।
২০২৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর ফ্রান্সের পার্লামেন্টে কোনো জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
এডিনবরার বিশ্ববিদ্যালয়ের শাবালের মতে, এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক ক্ষোভকে কোনো দল বা রাজনৈতিক আন্দোলন কার্যকরভাবে নিজেদের মধ্যে নিতে পারছে না।
রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ব্যয়, কর ও সরকারি সেবা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা করাও কঠিন হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—সরকার বদলালেও নীতিতে কি সত্যিই পরিবর্তন আসবে?
এই পরিস্থিতি ম্যাখোঁর জন্যও বড় ধাক্কা।
ক্ষমতায় আসার সময় তিনি তরুণ, আধুনিক ও গতিশীল ফ্রান্স গড়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বিক্ষোভ তার সেই ভাবমূর্তিকে দুর্বল করছে। শাবালের মতে, ম্যাখোঁ নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট করতে পারছেন না। মানুষের প্রতি তার আচরণও অনেকের কাছে সহানুভূতিশীল মনে হচ্ছে না।
পুলিশি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন
বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পর্তুগালের লিসবন বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউটের সামাজিক আন্দোলন বিশেষজ্ঞ গুইয়া আকর্নেরো বলেছেন, আগের বিভিন্ন বিক্ষোভে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান আন্দোলনে পুলিশের ছোড়া স্টান গ্রেনেডে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। কাছ থেকে ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টারে আঘাত পেয়ে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরের চোয়াল ভেঙেছে বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে।
সংস্থাটি শিশুদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের নিন্দা করেছে। তাদের মতে, বিক্ষোভের বেশির ভাগই শান্তিপূর্ণ ছিল।
আকর্নেরোর মতে, তরুণেরা শান্তিপূর্ণ ও কম বাধা সৃষ্টিকারী পদ্ধতিতে আন্দোলন করলেও তাদের ওপর সহিংস দমন-পীড়ন হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে কে
এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই।
নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরাসি ইতিহাস ও রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক পল স্মিথ মনে করেন, সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারেন ডানপন্থী নেতা মেরিন ল্য পেন। তার মতে, এই অস্থিরতা বামপন্থী নেতা মেলঁশোঁর প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তবে শাবাল সতর্ক করেছেন, বিক্ষোভ থেকে সরাসরি উগ্র ডানপন্থীদের লাভ হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তার মতে, ফ্রান্সে অতীতে অস্থিরতার ভয় রক্ষণশীল ও মধ্যপন্থী দলগুলোকে লাভবান করেছে। ১৯৬৮ সালের বিক্ষোভের পরও এমনটা দেখা গিয়েছিল।
ল্য পেনও বিক্ষোভকারীদের সব দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেননি। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বিক্ষোভকারীদের দাবিকে ‘বৈধ সামাজিক দাবি’ বলেছেন। তবে অভিযোগ করেছেন, এসব দাবি ‘উগ্র বামপন্থীদের হাতে জিম্মি’ হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উগ্র ডানপন্থীরা মানুষের ক্ষোভকে অভিবাসন ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে মেলঁশোঁর মতো বামপন্থীরা এই ক্ষোভের কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক কাঠামো ও পুঁজিবাদকে দায়ী করছেন।
ম্যাখোঁর সামনে এখন বড় পরীক্ষা
২০২৭ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ।
একদিকে তাদের দেখাতে হবে, তারা দেশে আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে ভোটারদের বোঝাতে হবে, আন্দোলনের পেছনে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি সেবার দুরবস্থা, বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো সমস্যার সমাধানও তারা করতে পারবে।
বর্তমান বিক্ষোভ তাই শুধু স্কুলের সমস্যা নিয়ে নয়। এটি ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় সেবা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার সংকটও সামনে এনেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই ক্ষোভকে কোন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের পক্ষে নিতে পারবে। কারণ এখন পর্যন্ত কোনো দলই এমন একটি রাজনৈতিক পথ দেখাতে পারেনি, যা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই অসন্তোষকে স্থায়ী পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
সূত্র : আলজাজিরা



