অবশেষে ‘মেগজিট’ অধ্যায়ের ইতি
- ছয় বছর পর সন্তানদের নিয়ে ব্রিটেনে ফিরছেন রাজার ছেলে হ্যারি ও স্ত্রী মেগান

হ্যারি ও মেগান মার্কল সন্তানদের নিয়ে চলতি মাসের শেষেই ব্রিটেনে ফিরছেন।
রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ততা, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই–সব পেছনে ফেলে ছয় বছর আগে আটলান্টিক পেরিয়েছিলেন তারা। গন্তব্য হয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়া। এ বার ফের উল্টো পথে যাত্রা। হ্যারি ও মেগান মার্কল সন্তানদের নিয়ে চলতি মাসের শেষেই ব্রিটেনে ফিরছেন। ২০২০ সালে রাজপরিবারের সক্রিয় সদস্যের দায়িত্ব ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার পর এটিই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়গুলোর একটি। তবে ফিরলেও তারা রাজকীয় দায়িত্বে ফিরে যাচ্ছেন না।
হ্যারি ও মেগানের সঙ্গে ব্রিটেনে আসছে তাদের দুই সন্তান সাত বছরের আর্চি এবং পাঁচ বছরের লিলিবেট। সেপ্টেম্বর থেকেই দু’জন ব্রিটেনের স্কুলে পড়াশোনা শুরু করবে। তবে এই পরিবার কোনও রাজপ্রাসাদে থাকবে না; লন্ডনের বাইরে একটি ব্যক্তিগত, অরাজকীয় বাসভবনে থাকার পরিকল্পনা করেছেন তারা। ক্যালিফোর্নিয়া ও পর্তুগালে নিজেদের সম্পত্তিও তারা ধরে রাখবেন বলে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন নয়, তবে আপাতত দীর্ঘ সময়ের জন্য তাদের মূল ঠিকানা হতে চলেছে ব্রিটেন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, এই প্রত্যাবর্তন ঘটছে এমন সময়ে যখন হ্যারি ও তার বাবা রাজা তৃতীয় চার্লসের সম্পর্কে জমে থাকা বরফ ধীরে ধীরে গলছে। গত জুলাইয়ে হ্যারি, মেগান, আর্চি ও লিলিবেট ব্রিটেনে এসে গ্লস্টারশায়ারের হাইগ্রোভ হাউসে রাজা চার্লস ও রানি ক্যামিলার সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে দেখা করেন। আর্চি ও লিলিবেটকে ২০২২ সালের পর সে বারই প্রথম সরাসরি দেখেছিলেন চার্লস।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পরিবারের ব্রিটেনে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা গত রবিবারই জানতে পারেন রাজা চার্লস। সূত্রের দাবি, ছোট ছেলে ও নাতি-নাতনিদের আরও কাছে পাওয়ার সম্ভাবনাকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। যদিও হ্যারি-মেগানের মুখপাত্র এবং বাকিংহাম প্যালেস–কোনও পক্ষই আনুষ্ঠানিক ভাবে এ নিয়ে মন্তব্য করেনি।
কিন্তু বাবার সঙ্গে দূরত্ব কমলেও বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে হ্যারির সম্পর্ক এখনও কার্যত তলানিতে। দু’ভাইয়ের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ এখনও ফেরেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ফলে হ্যারি-মেগানের ব্রিটেন প্রত্যাবর্তন রাজপরিবারে পূর্ণ পুনর্মিলনের সংকেত কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
ছয় বছর আগের ছবিটা ছিল একেবারেই অন্য রকম। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে হ্যারি ও মেগান জানান, তারা রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ কর্মরত সদস্যের দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে আর্থিকভাবে স্বাধীন হতে চান। এরপর প্রথমে কানাডা, পরে ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সমুদ্রতীরবর্তী অভিজাত মন্টেসিটো এলাকায় তাদের বাড়িই হয়ে ওঠে নতুন ঠিকানা। এই নাটকীয় বিচ্ছেদকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে তখন নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মেগজিট’।
তারপর সম্পর্কের ফাটল আরও প্রকাশ্যে আসে। ২০২১ সালে অপরাহ উইনফ্রেকে দেওয়া বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারে মেগান রাজপরিবারে বর্ণবাদ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ করেছিলেন। হ্যারি অভিযোগ করেছিলেন, বাবা তার ফোনও ধরছিলেন না। ২০২৩ সালে হ্যারির আত্মজীবনী ‘স্পেয়ার’ প্রকাশের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। সেখানে উইলিয়ামের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা থেকে শুরু করে বাবা ও রাজপরিবারের সঙ্গে তার বিরোধ–বহু ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ্যে আনেন হ্যারি।
ব্রিটেনে ফেরার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল নিরাপত্তা। রাজকীয় দায়িত্ব ছাড়ার পর হ্যারি আগের মতো স্বয়ংক্রিয় পুলিশি নিরাপত্তা হারান। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়েও ২০২৫ সালে আপিলে হেরে যান তিনি। তখন হ্যারি বলেছিলেন, এই ব্যবস্থায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিরাপদে ব্রিটেনে আনার কথা তিনি ভাবতেই পারছেন না। একই সাক্ষাৎকারে অবশ্য পরিবারের সঙ্গে মিটমাটের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে পরে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দীর্ঘ বিরতির পর বাবা-ছেলের সাক্ষাৎ হয়। আর গত মাসে হ্যারি শুধু নিজে নন, মেগান এবং দুই সন্তানকেও নিয়ে চার্লসের সঙ্গে দেখা করেন। সেই পুনর্মিলনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এবার স্থায়ী নয়, তবে দীর্ঘ মেয়াদে ব্রিটেনে ফিরে থাকার সিদ্ধান্ত সামনে এল।
তবে ব্রিটেনে ফিরছেন মানেই বাকিংহাম প্যালেসে আবার পুরনো জীবন, এমনটা নয়। ২০২০ সালে প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী হ্যারি ও মেগান ‘কর্মরত রাজপরিবারের সদস্য’ থাকছেন না। তাদের জন্য কোনও রাজকীয় বাসভবনও নির্ধারিত হচ্ছে না। হ্যারি তার দাতব্য কার্যক্রম, বিশেষ করে ইনভিকটাস গেমস-সংক্রান্ত কাজ চালিয়ে যাবেন; মেগানও নিজের ব্যবসা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবেন।
আমেরিকায় ছয় বছরে দু’জনেই নিজেদের আলাদা পরিচয় গড়ার চেষ্টা করেছেন। নেটফ্লিক্সের সঙ্গে অনুষ্ঠান নির্মাণ, স্পটিফাইয়ের পডকাস্ট চুক্তি, মেগানের জীবনধারাভিত্তিক উদ্যোগ এবং হ্যারির আত্মজীবনী–ছিল একের পর এক প্রকল্প। ফল অবশ্য মিশ্র। ‘স্পেয়ার’ বিপুল বিক্রি হলেও স্পটিফাইয়ের চুক্তি শেষ হয়ে যায়, আর মেগানের নেটফ্লিক্স অনুষ্ঠান তৃতীয় মৌসুমের জন্য নবায়ন হয়নি।
এখন নজর তাই অন্য জায়গায়। ব্রিটেনে আর্চি ও লিলিবেটের স্কুলজীবন শুরু হলে দাদা চার্লসের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। ক্যানসারের চিকিৎসা চলা রাজা চার্লসও ছোট ছেলের পরিবারকে এত কাছে পাচ্ছেন দীর্ঘ ছয় বছর পর। তবে এক দিকে বাবার সঙ্গে মিটমাটের সম্ভাবনা, অন্য দিকে উইলিয়ামের সঙ্গে অটুট দূরত্ব... হ্যারি-মেগানের ‘ঘরে ফেরা’ তাই নিছক ঠিকানা বদল নয়। রাজপরিবারের বহু বছরের প্রকাশ্য বিরোধে এটি নতুন অধ্যায়ের শুরু কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে ব্রিটেন।






