বিপাকে স্টারমার, দলের ভেতরেই বাড়ছে সরে দাঁড়ানোর চাপ

যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির ঐতিহাসিক ভরাডুবির পর প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন দলের এমপি ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা। তাদের সতর্কবার্তা, স্টারমার সরে না দাঁড়ালে তিনি ‘লেবার পার্টিকে শেষ করে দিতে পারেন’ এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে দল ‘নিধনযজ্ঞের’ মুখে পড়তে পারে।
এমনকি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংসের’ অবস্থায় চলে যেতে পারে। কয়েকজন এমপি বলেছেন, স্টারমারের উচিত এখনই সরে যাওয়ার একটি সুশৃঙ্খল সময়সূচি ঘোষণা করা। যাতে সম্ভাব্য নেতৃত্বপ্রত্যাশীরা গ্রীষ্মেই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারেন।
ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে লেবারের বড় পরাজয়ের পর এই দাবি উঠেছে। দলটি এমন কয়েকটি কাউন্সিল হারিয়েছে, যেগুলো আগে কখনো অন্য কোনো দলের নিয়ন্ত্রণে যায়নি। বিকেন্দ্রীকরণের পর প্রথমবারের মতো ওয়েলসেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে লেবার। জাতীয় পর্যায়ে হিসাব করলে লেবারের ভোটের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশে, যা ১৯৭৯ সালে এই হিসাব চালু হওয়ার পর দলটির সবচেয়ে খারাপ ফল।
ইংল্যান্ডে রিফর্ম ইউকের কাছে শত শত কাউন্সিল আসন হারিয়েছে লেবার। দীর্ঘদিনের ঘাঁটি টেমসাইড, ব্ল্যাকবার্ন, গেটসহেড ও সান্ডারল্যান্ডও নাইজেল ফারাজের দলের হাতে গেছে। এর মধ্যে সান্ডারল্যান্ড ৫০ বছর ধরে লেবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওয়েলসে সেনেড নির্বাচনে বিপর্যয়ের মধ্যে ফার্স্ট মিনিস্টার ব্যারোনেস মর্গান অব এলি নিজের আসন হারিয়েছেন। এতে প্রথমবারের মতো প্লেইড কামরির নেতৃত্বে প্রশাসন গঠনের পথ তৈরি হয়েছে।
স্টারমার অবশ্য পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি ‘সরে গিয়ে দেশকে বিশৃঙ্খলায় ঠেলে’ দেবেন না। তবে অন্য কোনো নেতার হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার সম্ভাবনা তিনি স্পষ্টভাবে নাকচ করেননি।
দলের পেছনের সারির সমালোচক এমপিদের পাশাপাশি সাবেক পরিবহনমন্ত্রী লুইস হেইগের মতো মধ্যপন্থী নেতারাও পরিবর্তনের কথা বলেছেন। হেইগ বলেছেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি পরিবর্তন’ আনতে না পারলে স্টারমার দলকে পরবর্তী নির্বাচনে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না।
ট্রেড ইউনিয়নগুলোর চাপও বেড়েছে। লেবারের অন্যতম বড় আর্থিক পৃষ্ঠপোষক ইউনিসনের সাধারণ সম্পাদক আন্দ্রেয়া ইগান সতর্ক করে বলেছেন, স্টারমার সরে না দাঁড়ালে দল ‘অস্তিত্বহীনতার’ মুখে পড়তে পারে। তিনি শুধু নেতা নয়, ‘পুরো পদ্ধতির’ পরিবর্তনের আহ্বান জানান। ইউনাইট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শ্যারন গ্রাহাম বলেছেন, ‘স্টারমারের সামনে এখন ‘বদলাও, নয়তো মরো’ ধরনের পরিস্থিতি। তার সতর্কবার্তা, এই ফল ‘দলটির শেষের শুরুও হতে পারে’।
লেবারের সঙ্গে যুক্ত ১১টি ইউনিয়নের নেতারা শুক্রবার বিকালে জরুরি বৈঠক করেন। পরে তারা ‘বিপর্যয়কর’ ফল নিয়ে স্টারমারের সঙ্গে বৈঠকের দাবি জানান। তারা লেবারের জন্য ‘র্যাডিক্যাল নতুন দিকনির্দেশনা’ চান, যা দলকে আরও বামপন্থী অবস্থানের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
দুটি ইউনিয়নের সূত্র বলেছে, তারা কয়েক দিনের মধ্যেই স্টারমারের বিকল্প কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দিতে পারে। আলোচনায় বেশি আসছে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনারের নাম। এক সূত্র বলেছে, নেতৃত্বের দৌড় ‘ খুব, খুব দ্রুত’ এগোতে পারে।
সরকারি সূত্র দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছে, লেবারের বিবদমান অংশগুলোকে এক করতে এবং নির্বাচনে জয় এনে দিতে সক্ষম একমাত্র প্রার্থী বার্নহাম। তবে তাকে উপনির্বাচনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সংসদে ফিরতে স্টারমার অনুমতি দেবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বার্নহামপন্থী চাপগোষ্ঠী মেইনস্ট্রিম বলেছে, স্থানীয় নির্বাচনের ফল লেবার পার্টির শীর্ষে থাকা ব্যর্থ রাজনৈতিক পরীক্ষার শেষ স্টেশন।
গোষ্ঠীটি বলেছে, আজ মনে হচ্ছে, আমাদের দলের বর্তমান নেতৃত্ব ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে আমাদের নিয়ে যাবে— এমন সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে সুশৃঙ্খল পরিবর্তন এবং এরপর কে ও কী আসবে, তা নিয়ে সত্যিকারের উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক বিতর্ক দরকার।
লন্ডনের মেয়র সাদিক খানও সতর্ক করেছেন, গতি ও কাজের ধরনে পরিবর্তন না আনলে তা লেবারের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। লন্ডন, ওয়েলস ও ইংল্যান্ড জুড়ে আমরা স্কটল্যান্ডের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিতে আছি, যেখানে আমরা এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারিনি।
তবে মন্ত্রিসভার সদস্যরা স্টারমারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারা নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেউ কেউ ‘নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকা’, ‘নিজেদের ভেতর ঢুকে পড়া’ এবং নেতৃত্বের জল্পনায় ‘পথচ্যুত’ হওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, ‘উড়োজাহাজ চলার সময় পাইলট বদলানো’ উচিত নয়।
এর জবাবে সাবেক ছায়া অর্থমন্ত্রী জন ম্যাকডনেল বলেছেন, ‘কখনো কখনো বদলাতে হয়, যদি উড়োজাহাজ নাক বরাবর নিচে নামতে থাকে।’
জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ভোটাররা স্পষ্ট করে জানাচ্ছেন, ভাঙা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার ওপর তাদের ক্ষোভ রয়েছে। ‘ কিয়ার যেমন বলেছেন, ২০২৪ সালে লেবার যে পরিবর্তনের ম্যান্ডেট পেয়েছিল, তা বাস্তবায়নে আমাদের আরও এগোতে হবে এবং দেখাতে হবে, আমরা কীভাবে দেশের পরিবর্তনের ডাকের জবাব দেব।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, সরকার কীভাবে এগোবে, তা তুলে ধরতে স্টারমার ‘আমার সমর্থন পাবেন’। তিনি বলেছেন, ‘কিয়ার স্টারমার আমাদের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কীভাবে তা করবেন, সেটি তুলে ধরবেন। এতে তিনি আমার সমর্থন পাবেন।’
স্টারমারের ভাবনার সঙ্গে পরিচিত এক সূত্র বলেছে, তার সরে দাঁড়ানোর ‘কোনো লক্ষণই নেই।’ সূত্রটির দাবি, লেবারের পরাজয় দেখিয়েছে বার্নহামের ব্রিটিশ সংসদে ফেরার পথ নেই, আর বামদিকে ঝোঁকারও সমর্থন নেই। তিনি বলেছেন, ‘উত্তর ও মিডল্যান্ডসে রিফর্মের কাছে যা হারানোর ছিল, সবই আমরা হারিয়েছি। এর অর্থ, অ্যান্ডি ও অ্যাঞ্জেলার পুরো নীতিপথই অর্থহীন।’
লেবার পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান ইয়ান লাভারি সতর্ক করেছেন, লেবার ‘সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন’ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। তিনি বলেছেন, স্টারমার সরে দাঁড়াতে রাজি না হলে নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন। লাভারি বলেছেন, ‘দলের অনেকের মতো আমিও মনে করি, অদূর ভবিষ্যতেই দলটি অস্তিত্ব হারাতে পারে।
লেবার এমপি কিম জনসন বলেছেন, স্টারমারের উচিত ব্যারোনেস মর্গানের উদাহরণ অনুসরণ করে ফলাফলের ‘দায়িত্ব নেওয়া’। ব্ল্যাকবার্ন কাউন্সিলের নেতা ফিল আইলি বলেছেন, ‘লেবার কাউন্সিলরদের আসন হারানো ‘একেবারেই মর্মান্তিক’। তিনি স্টারমারের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেন।’
লন্ডনেও লেবার প্রতীকী ধাক্কা খেয়েছে। স্টারমারের নিজ আসনের ক্যামডেন কাউন্সিলের লেবার নেতা রিচার্ড ওলশেভস্কি গ্রিন পার্টির কাছে পরাজিত হয়েছেন। গ্রিন পার্টি হ্যাকনি মেয়র পদও জিতেছে, দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনে লেবার মেয়রকে হারিয়েছে এবং আগে লেবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা নরউইচ সিটি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে।
গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কি ঘোষণা করেছেন, লেবার ও কনজারভেটিভ— দুই দলের রাজনীতি ‘মৃত’। এর আগে রিফর্ম নেতা ফারাজও বলেছিলেন, তিনি ব্রিটিশ রাজনীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন দেখছেন।
ওয়েস্টমিনস্টার আসনে ফলের আনুমানিক হিসাব দেখিয়েছে, সাধারণ নির্বাচনে একই ভোটের হার হলে ফারাজ প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, যদিও এতে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
রিফর্ম উত্তর ইংল্যান্ডের লেবারের রেড ওয়াল এলাকা এবং দক্ষিণের কনজারভেটিভ ঘাঁটি–এসেক্স, সাফোক ও নরফোকেও অগ্রগতি করেছে।
কনজারভেটিভদের দিনটিও খারাপ গেছে। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় টানা দ্বিতীয় বছর কাউন্সিল আসন হারিয়েছে দলটি, যা অন্তত ১৯৭৫ সালের পর দেখা যায়নি। তবে ওয়েস্টমিনস্টার কাউন্সিল পুনরুদ্ধার এবং ওয়ান্ডসওয়ার্থে সবচেয়ে বড় দল হওয়া দলটির নেত্রী কেমি ব্যাডেনকের জন্য প্রতীকী সাফল্য।
স্কটল্যান্ডে ১২৯টির মধ্যে মাত্র ৭টি আসনের ফল আসার পরই লেবার নেতা আনাস সারোয়ার এসএনপির কাছে পরাজয় মেনে নেন। তিনি আগেও স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন এবং স্কটিশ লেবারের সমর্থন ধসের জন্য তাকে দায়ী করেছিলেন। স্কটিশ লেবারের উপনেতা জ্যাকি বেইলি বলেছেন, স্কটিশ লেবার ‘জাতীয় ঢেউয়ের নিচে ডুবে গেছে’।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা সামগ্রিকভাবে সামান্য অগ্রগতি করেছে। রিফর্ম ইউকের বাইরে তারাই একমাত্র দল, যারা হারানোর চেয়ে বেশি আসন জিতেছে।




