আগামীর সময়

যুক্তরাজ্যে প্রতি ৫ জনে একজন মা খুন হচ্ছেন সন্তানের হাতে

যুক্তরাজ্যে প্রতি ৫ জনে একজন মা খুন হচ্ছেন সন্তানের হাতে

প্রতীকী ছবি

যুক্তরাজ্যে গত এক বছরে যত নারী-পুরুষের সহিংসতায় প্রাণ গেছে তাদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজন হত্যার অভিযোগ উঠেছে নিজ ছেলের বিরুদ্ধে। এমন তথ্য উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়।

আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গত এক বছরে নিহত ১০৮ জন নারীর নাম পড়ে শুনিয়েছেন লেবার পার্টির এমপি জেস ফিলিপস৷

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে পার্লামেন্টে আয়োজিত বিতর্কে টানা একাদশ বছরের মতো তিনি এই নামগুলো পড়ে শুনিয়েছেন।

এই তালিকা সংরক্ষণ করে ফেমিসাইড সেনসাস–এর ‘কাউন্টিং ডেড উইমেন’ প্রকল্প। তাদের তথ্য অনুযায়ী, তালিকায় থাকা নিহতদের মধ্যে ১৯ জন মা রয়েছেন, যাদের হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন তাদেরই ছেলে। ফেমিসাইড সেনসাসের ১৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে এটিই সর্বোচ্চ ‘ম্যাট্রিসাইড’ বা সন্তানের হাতে মায়ের হত্যার হার।

যুক্তরাজ্যে মায়েদের হত্যার ঘটনা বাড়তে থাকায় তারা গভীর উদ্বেগ নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সংকট, মাদকাসক্তি এবং আবাসন–সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এই প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে মনে করেন ফেমিসাইড সেনসাসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্যারি ওক্যালাহান।

‘অনেক ক্ষত্রেই দেখা যায়, যারা নিজেদের মাকে হত্যা করেছে, তাদের আগের সম্পর্কগুলোতে নির্যাতনের ইতিহাস ছিল। সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তারা মায়ের সঙ্গেই এসে থাকতে শুরু করে’—উল্লেখ করেন ফেমিসাইডের সহপ্রতিষ্ঠাতা।

ক্যারি ওক্যালাহান বলছিলেন, গত ১০ বছর ধরে আমরা ম্যাট্রিসাইড নিয়ে তথ্য প্রকাশ করছি। কিন্তু এখনো কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা এই সমস্যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি, সমাধানে দায়িত্ব নেওয়ার কথাও বলেনি।’

ওক্যালাহানের ভাষ্য, ‘নিজ সন্তানের কাছ থেকে প্রাণঘাতী সহিংসতার ঝুঁকিতে আছেন—এভাবে নারীদের খুব কমই বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাজ্যজুড়ে বয়স্ক নারীদের জন্য বিশেষায়িত সহায়তা সেবাও প্রায় নেই।’

গত বছর দ্য গার্ডিয়ান–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৫ বছরে যুক্তরাজ্যে পুরুষের হাতে নিহত নারীদের প্রায় প্রতি ১০ জনের একজন ছিলেন এমন মা, যাদের হত্যা করেছে তাদেরই ছেলে।

ফেমিসাইড সেনসাসের ‘টু থাউজ্যান্ড উইমেন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে ১৭০ জনের বেশি মা তাদের ছেলের হাতে নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনার ৫৮ শতাংশ ক্ষেত্রে মানসিক অসুস্থতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

নারী ও কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে গত ডিসেম্বর একটি কৌশলপত্র প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। এতে ছেলেদের মধ্যে ক্ষতিকর আচরণ রোধ, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক শিক্ষা দেওয়া এবং পর্নোগ্রাফির প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

নারী অধিকার সংগঠনগুলো এই উদ্যোগকে ‘একটি মাইলফলক’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তারা বলেছে, আগামী এক দশকে নারী ও কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা অর্ধেকে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্য সরকার নিয়েছে, তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনাটি ‘গুরুতরভাবে অপর্যাপ্ত’।

ওক্যালাহানের ভাষ্যে, কৌশলপত্রে প্রথমবারের মতো ‘ফেমিসাইড’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে, যা ‘সঠিক পথে একটি পদক্ষেপ’। তবে বিশেষায়িত সংগঠনগুলোর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো স্বীকৃতি পায়নি।

সরকারের দাবি, এই কৌশল বাস্তবায়নে প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ড বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের থেরাপিউটিক সহায়তার জন্য ৫ কোটি পাউন্ড, গৃহস্থালি সহিংসতার শিকারদের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করতে স্থানীয় কাউন্সিলগুলোকে ১ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড এবং বিচারব্যবস্থার পুরো প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সহায়তায় ৫৫ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

ওক্যালাহানের মতে, ‘নারী নেতৃত্বাধীন বিশেষায়িত দাতব্য সংস্থাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’

‘এই সংকট বহু বছর ধরেই চলছে। সরকার বিষয়টি জানে, কিন্তু বাস্তবে তেমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না’—উল্লেখ করেন ওক্যালাহান।

    শেয়ার করুন: