ব্রিটিশ ড্রোনে রাশিয়ার গভীরে হামলা
- ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলায় প্রথমবার ব্রিটেনে তৈরি ড্রোন ব্যবহারের খবর
- রাশিয়ার দাবি, যুদ্ধে সরাসরি জড়াচ্ছে ব্রিটেন
- পাল্টা প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম বলেছেন, কিয়েভের পাশে ‘শতভাগ’ থাকবে লন্ডন

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম বলেছেন, কিয়েভের পাশে ‘শতভাগ’ থাকবে লন্ডন
এত দিন যুদ্ধের আগুন ছিল মূলত ইউক্রেনের মাটিতে। এখন সেই আগুন যত গভীরে রাশিয়ার ভূখণ্ডে পৌঁছচ্ছে, ততই বদলাচ্ছে মস্কোর ভাষা। ইউক্রেনের সাম্প্রতিক দূরপাল্লার হামলায় প্রথমবার ব্রিটেনে তৈরি ড্রোন ব্যবহারের খবর সামনে আসার পর যুক্তরাজ্যকে সরাসরি ‘পরিণতি ভোগের’ হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়া। মঙ্গলবার রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, রুশ ভূখণ্ডে হামলায় ব্রিটেনের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে মস্কো লন্ডনকে ইউক্রেন যুদ্ধের অংশগ্রহণকারী হিসেবেও বিবেচনা করতে পারে।
বিতর্কের সূত্রপাত গত শনিবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়, ব্রিটিশ দুটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি ড্রোন ইউক্রেনের ‘ডিপ স্ট্রাইক’ বা রাশিয়ার অনেক ভেতরে থাকা সামরিক, শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেন প্রথমবার ব্রিটিশ ড্রোন ব্যবহার করে মূল রুশ ভূখণ্ডের এত গভীরে আঘাত হেনেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট হামলায় কোন ড্রোন ব্যবহৃত হয়েছে তা নিশ্চিত করেনি, তবে মন্ত্রণালয়ের সূত্র ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের তৈরি দুটি ড্রোন ব্যবহারের খবর সঠিক বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
ব্রিটেনকে ‘পরিণতি ভোগের’ কড়া হুঁশিয়ারি রাশিয়ার
লন্ডনে রুশ দূতাবাসের প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। তাদের অভিযোগ, শান্তির কথা বললেও ব্রিটেন বাস্তবে ইউক্রেন যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করার পথ বেছে নিচ্ছে। মস্কোর বক্তব্য, কিয়েভকে যত বেশি এমন অস্ত্র দেওয়া হবে যা রুশ ভূখণ্ডের গভীরে আঘাত করতে পারে, ব্রিটেনের দায়ও তত বাড়বে। দূতাবাস সতর্ক করেছে, লন্ডনের এই পদক্ষেপের ‘পরিণতি’ থাকবে এবং তার জবাব দিতে হবে ব্রিটেনকেই। ঠিক কী ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, তা অবশ্য স্পষ্ট করা হয়নি।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভের বক্তব্য সেই হুমকির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। তার মতে, শুধু অস্ত্র সরবরাহ এবং সরাসরি হামলায় অংশগ্রহণ এক বিষয় নয়; কিন্তু রুশ ভূখণ্ডে হামলায় ব্রিটিশ সম্পৃক্ততা যদি সরাসরি হয়ে থাকে, তা হলে মস্কো সেটিকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ হিসেবেও দেখার অধিকার রাখে। রাশিয়া অতীতেও অভিযোগ করেছে, ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞরা ইউক্রেনের কিছু হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লন্ডন এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।
স্কাই নিউজও মঙ্গলবার মস্কোর নতুন হুঁশিয়ারিকে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার ধারাবাহিক হুমকির সর্বশেষ পর্ব হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লন্ডনের রুশ দূতাবাস ব্রিটেনকে ‘মূল্য’ দিতে হবে বলে সতর্ক করেছে; তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ব্রিটেনকে লক্ষ্য করে মস্কোর এমন সতর্কবার্তা এটিই প্রথম নয়।
কোন ব্রিটিশ ড্রোন নিয়ে এত উত্তেজনা
আলোচনায় আসা ড্রোনগুলোর মধ্যে নাম প্রকাশ পেয়েছে ‘নিয়ান’-এর। এটি ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএই সিস্টেমসের মালিকানাধীন ক্যালেন-লেনজের তৈরি জেটচালিত একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বলেছে, অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আকাশসীমা ভেদ করে দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর পাল্লা ১৫০ মাইলের বেশি এবং প্রতিটির আনুমানিক মূল্য প্রায় এক লাখ পাউন্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউক্রেন গত কয়েক মাসে রাশিয়ার জ্বালানি ও সামরিক সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার হামলা অনেক বাড়িয়েছে। রুশ তেল শোধনাগার, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের গুদাম, পরিবহণকেন্দ্র এবং সরবরাহব্যবস্থা এসব হামলার প্রধান লক্ষ্য। ৬ আগস্ট মস্কো থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বের ইয়ারোস্লাভলে স্লাভনেফট-ইয়ানোস তেল শোধনাগারে হামলায় বড় আগুন লাগে। ইউক্রেনের দাবি, শোধনাগারটির কয়েকটি তেলের ট্যাংক ও প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। রুশ আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষও হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে।
এর পাশাপাশি ভলগোগ্রাদসহ আরও কয়েকটি অঞ্চলের তেল স্থাপনায় ইউক্রেনীয় হামলার সঙ্গে ব্রিটিশ ড্রোন ব্যবহারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে কোন নির্দিষ্ট হামলায় কোন ব্রিটিশ ড্রোন ব্যবহৃত হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তাই এ অংশে প্রকাশিত সামরিক প্রতিবেদনের তথ্যকেই ভিত্তি হিসেবে দেখতে হচ্ছে।
মস্কোর হুমকির জবাবে পিছু হটছে না লন্ডন
রাশিয়ার হুঁশিয়ারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম স্পষ্ট করে দেন, মস্কোর বক্তব্যে ইউক্রেননীতি বদলাবে না।
মঙ্গলবার উলভারহ্যাম্পটনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে ‘১০০ শতাংশ’ সমর্থন করবে ব্রিটেন। তাঁর বক্তব্য, ইউক্রেনের আত্মরক্ষায় সহায়তা করা বহু বছর ধরেই ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান এবং তাঁর সরকারও সেই অবস্থান থেকে সরে আসবে না। তিনি ব্রিটেনকে এমন বন্ধু হিসেবে তুলে ধরেন, যে সংকটের সময়ে কিয়েভকে ছেড়ে যাবে না।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও বলেছে, ইউক্রেনের আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। জুনে লন্ডন ঘোষণা করেছিল, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইউক্রেনকে দেড় লাখ ড্রোন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলোসহ আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য ঘোষিত সহায়তা প্যাকেজটির মূল্য প্রায় ৭৫ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড। একই প্যাকেজে ৩৫০টির বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডার দেওয়ার কথাও রয়েছে।
তবে ওই দেড় লাখ ড্রোনের অধিকাংশই ইউক্রেনে উৎপাদিত হবে ব্রিটিশ অর্থায়নে। ব্রিটেনে তৈরি ‘নিয়ান’-এর মতো দূরপাল্লার আক্রমণকারী ড্রোন সেই বৃহৎ সংখ্যার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
‘স্টর্ম শ্যাডো’র পর ড্রোন, সত্যিই কি নতুন সীমা পেরোল ব্রিটেন?
বিশ্লেষকেরা অবশ্য বলেছেন, ব্রিটিশ ড্রোনের ব্যবহার রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এটি এমন নয় যে এই প্রথম ব্রিটিশ অস্ত্র রাশিয়ার ভেতরে পৌঁছল। তার আগেই ব্রিটেন ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ‘স্টর্ম শ্যাডো’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে এবং সেগুলোও রুশ ভূখণ্ডে লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিটি স্টর্ম শ্যাডোর দাম ১০ লাখ পাউন্ডের বেশি বলে ধারণা করা হয়। তুলনায় নিয়ান অনেক সস্তা এবং বড় সংখ্যায় ব্যবহারযোগ্য।
বরং পরিবর্তনটি যুদ্ধের ধরনে। ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের বদলে তুলনামূলক সস্তা ড্রোন দিয়ে নিয়মিতভাবে শত শত কিলোমিটার ভেতরের তেল শোধনাগার, গুদাম ও সরবরাহকেন্দ্রে হামলা করা সম্ভব হচ্ছে। ইউক্রেনের লক্ষ্য হলো রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং যুদ্ধকে রুশ ভূখণ্ডের মানুষের কাছেও দৃশ্যমান করে তোলা। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের ড্রোন মস্কো ও আশপাশের এলাকাতেও হামলা চালিয়েছে। ১৬-১৭ আগস্ট রাতের বড় অভিযানে কয়েক শ ড্রোন রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের দিকে পাঠানো হয়।
রাশিয়াও একই সময়ে ইউক্রেনের শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। ১৮ আগস্ট খারকিভ অঞ্চলের পেচেনিহি গ্রামে রুশ হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হন। অর্থাৎ দূরপাল্লার হামলার বিস্তার এখন দুই দিকেই যুদ্ধকে আরও গভীর করছে।
রাশিয়ার হুমকি কতটা বাস্তবসম্মত?
মস্কো সরাসরি ব্রিটেনে সামরিক হামলার কথা বলেনি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বরং সাইবার হামলা, নাশকতা, বিভ্রান্তিমূলক প্রচার, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা কিংবা ইউরোপে গোপন অভিযান বৃদ্ধির মতো ‘হাইব্রিড’ পদ্ধতিতে হতে পারে। ব্রিটেন এর আগেও রাশিয়াকে সাইবার হামলা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী করেছে; মস্কো অনেক অভিযোগ অস্বীকার করে।
সমুদ্রেও উদ্বেগ বাড়ছে। ব্রিটিশ রয়্যাল নেভি জানিয়েছে, চলতি বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের আশপাশে রুশ জাহাজ নজরদারিতে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি সময় ব্যয় করতে হয়েছে। শুধু জুলাইতেই ডোভার প্রণালি ও উত্তর সাগরে রুশ জাহাজ পর্যবেক্ষণে ২১ দিন কাটিয়েছে ব্রিটিশ নৌবাহিনী।
ফলে মস্কোর হুমকিকে নিছক শব্দের লড়াই বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও নেই, আবার এর অর্থ রাশিয়া এখনই ব্রিটেনে সরাসরি সামরিক হামলা করতে যাচ্ছে এমন প্রমাণও নেই। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি অন্য জায়গায়: এক পক্ষ প্রতিটি নতুন অস্ত্রকে ‘আত্মরক্ষার সহায়তা’ বলছে, অন্য পক্ষ সেটিকেই ‘যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ’ হিসেবে চিহ্নিত করছে। এই দুই ব্যাখ্যার দূরত্ব যত কমছে, ভুল হিসাবের আশঙ্কা তত বাড়ছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকেই ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে আসছে ব্রিটেন। চার বছরের বেশি সময় পরে সেই সহায়তার নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে ছোট একটি ড্রোন। আকারে স্টর্ম শ্যাডোর তুলনায় অনেক ছোট, দামেও অনেক কম কিন্তু রাশিয়ার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বলছে, তার গুরুত্ব শুধু বিস্ফোরণের শক্তিতে নয়।
কারণ যুদ্ধের শুরুতে প্রশ্ন ছিল, পশ্চিমা অস্ত্র ইউক্রেনকে কতটা রক্ষা করবে। এখন প্রশ্ন বদলে যাচ্ছে, সেই অস্ত্র রাশিয়ার কত গভীরে পৌঁছবে। আর প্রতিটি নতুন মাইলের সঙ্গে মস্কো ও লন্ডনের মাঝের নিরাপদ দূরত্বটিও যেন একটু একটু করে ছোট হচ্ছে।






