রিফর্ম ইউকের উত্থানে শঙ্কিত ব্রিটেনের অভিবাসীরা, কী বলছেন বাংলাদেশিরা?

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকে-এর জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দলটির নেতা নাইজেল ফারাজ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ নীতিনির্ধারকেরা অভিবাসন নিয়ে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, তা ব্রিটেনে বসবাসরত বৈধ ও অবৈধ–উভয় ধরনের অভিবাসীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, আগামী সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে রিফর্ম ইউকে ব্রিটেনের দুই প্রধান দল লেবার এবং কনজারভেটিভ পার্টির সঙ্গে সমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এই উত্থান শুধু রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাচ্ছে না; অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
যুক্তরাজ্যে বর্তমান অভিবাসনের হারকে ‘জাতীয় নিরাপত্তা সংকট’ হিসেবে অভিহিত করেছে রিফর্ম। দলটির ভাষায়, এটি একটি ‘অভিবাসী আগ্রাসন’, যা বন্ধ করতে ক্ষমতায় এলে তারা ব্যাপক নির্বাসন, নতুন আটককেন্দ্র নির্মাণ, স্থায়ী বসবাসের অধিকার বাতিল এবং অভিবাসীদের জন্য কল্যাণসেবা সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নেবে।
গণহারে বহিষ্কারের পরিকল্পনা
রিফর্ম ইউকে ক্ষমতায় এলে ‘অবৈধ অভিবাসী’দের বিরুদ্ধে বিশেষ আইন প্রণয়নের কথা বলছে। দলটির প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি কেন্দ্রীয় ‘ডিপোর্টেশন কমান্ড’ গঠন করা হবে, যা বছরে কয়েক লাখ মানুষকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতা পাবে।
দলটির নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, গত কয়েক বছরে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে যাঁরা যুক্তরাজ্যে এসেছেন, তাঁদের আবেদন পুনরায় পর্যালোচনা করা হবে। কারও প্রবেশপথ বা ভিসা অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তাঁর বসবাসের অনুমতি বাতিল করে ফেরত পাঠানো হতে পারে।
এ ছাড়া, যারা স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়বে, তাদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ, অভিবাসীদের একটি অংশকে নগদ অর্থ দিয়ে যুক্তরাজ্য ছাড়তে উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্থায়ী বসবাসের অধিকার বাতিলের আশঙ্কা
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে রিফর্ম ইউকের একটি প্রস্তাব, বর্তমান ইনডেফিনিট লীভ টু রিমেইন (আইএলআর) বা স্থায়ী বসবাসের অধিকার ব্যবস্থা বাতিল করা।
বর্তমানে বৈধভাবে কয়েক বছর বসবাস ও কাজের পর বিদেশিরা এই 'আইএলআর' পেয়ে স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে থাকতে পারেন। পরে নাগরিকত্বের আবেদনও করতে পারেন। কিন্তু রিফর্ম ইউকে এই ব্যবস্থা তুলে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আদলে নতুন করে নির্দিষ্ট মেয়াদি নবায়নযোগ্য ভিসা চালুর কথা বলছে।
এতে বহু বছর ধরে যুক্তরাজ্যে থাকা বৈধ অভিবাসীদেরও পুনরায় নতুন নিয়মে আবেদন করতে হতে পারে। নতুন শর্তের মধ্যে উচ্চ আয়ের সীমা, কঠোর ইংরেজি দক্ষতা, পরিবারের সদস্য আনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা এবং কঠিন যোগ্যতা নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে।
অভিবাসী অধিকারকর্মীদের মতে, এটি কার্যকর হলে বহু পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়বে। কারণ বর্তমানে যাঁরা স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, তাঁদের একটি বড় অংশ নতুন শর্ত পূরণ করতে নাও পারেন।
সব ধরনের ভিসায় কড়াকড়ি
রিফর্ম ইউকে শুধু স্থায়ী বসবাস নয়, ছাত্র, কর্মী, পরিবারভিত্তিক–সব ধরনের ভিসা ব্যবস্থায় কড়াকড়ি আনার পক্ষে।
দলটি উচ্চ বেতনের শর্ত আরোপ, ভিসার সংখ্যা কমানো এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের ভিসা সীমিত করার মতো প্রস্তাব দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্যসেবা খাতে কর্মী এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অভিবাসীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
এনএইচএস ও সামাজিক সুবিধা সীমিত করার প্রস্তাব
রিফর্ম ইউকের আরেকটি বিতর্কিত পরিকল্পনা হলো অভিবাসীদের জন্য জাতীয় স্বাস্থ্য সার্ভিসের (এনএইচএস) সেবা ও সরকারি ভাতা সীমিত করা।
দলটির বক্তব্য, ব্রিটিশ নাগরিক নন–এমন অনেকেই ‘রাষ্ট্রীয় সেবার ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন৷’ তাই নতুন ভিসাধারীদের স্বাস্থ্যসেবা, বেকার ভাতা বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা কমিয়ে আনা হবে।
এটি বাস্তবায়িত হলে বিদেশি কর্মী, বিশেষ করে হাসপাতাল, কেয়ার সেক্টর ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বড় চাপ পড়বে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বহু পরিবার এই খাতে কাজ করায় উদ্বেগ আরও বেশি।
মানবাধিকার সুরক্ষা থেকে সরে আসার পরিকল্পনা
রিফর্ম ইউকে ক্ষমতায় এলে ইউরোপিয়ান কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস থেকে যুক্তরাজ্যকে বের করে আনার কথা বলছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার আইন বাতিল করে নতুন ‘ব্রিটিশ বিল অব রাইটস’ প্রণয়নের কথা বলছে দলটি।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যকর হলে বহিষ্কার বা আটকাদেশের বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ কমে যেতে পারে। অর্থাৎ, অভিবাসীদের আইনি সুরক্ষা দুর্বল হবে।
বাংলাদেশিদের জন্য কী অর্থ বহন করে?
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা কয়েক লাখ। লন্ডন, বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম, বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারে বাংলাদেশিদের বড় কমিউনিটি রয়েছে।
এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ স্বাস্থ্যসেবা, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা ও ছোট উদ্যোক্তা খাতে কাজ করেন। অনেকে কর্মী ভিসা, পরিবারভিত্তিক ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতিতে আছেন।
রিফর্ম ইউকের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নতুন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যে আসা কঠিন হতে পারে, কর্মী ভিসার শর্ত কঠোর হলে অনেকেই চাকরি ধরে রাখতে সমস্যায় পড়তে পারেন৷ স্থায়ী বসবাসের পথ বন্ধ হলে পরিবার পুনর্মিলন জটিল হবে৷ এনএইচএস সুবিধা সীমিত হলে নিম্ন আয়ের পরিবারে স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়বে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা বলছেন, এতে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বৈধ পরিবারগুলোর মধ্যেও ভয় তৈরি হয়েছে। কারণ নীতির পরিবর্তনে বর্তমান বৈধ অবস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ফারাজের উত্থান কেন গুরুত্বপূর্ণ
নাইজেল ফারাজ ব্রিটেনের রাজনীতিতে নতুন নন। ব্রেক্সিট বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার জন্য যে আন্দোলন হয়েছিল, তার অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি৷ দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপবিরোধী এবং কড়া অভিবাসনবিরোধী অবস্থানে সোচ্চার ডানপন্থী এই নেতা।
সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর নেতৃত্বে রিফর্ম ইউকে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মূলত অভিবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অসন্তোষকে পুঁজি করে দলটি সমর্থন বাড়াচ্ছে।
যদিও বর্তমানে দলটির পার্লামেন্টে আসন খুবই সীমিত, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি ভবিষ্যতে জোট সরকার গঠনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, রিফর্ম ইউকে অভিবাসন নীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
অনিশ্চয়তার সামনে প্রবাসীরা
পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন এখনো কয়েক বছর দূরে, ২০২৯ সালে। তবু রিফর্ম ইউকের উত্থান এবং তাদের কঠোর অভিবাসন পরিকল্পনা ইতিমধ্যে ব্রিটেনে বসবাসরত বহু অভিবাসী পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি তাঁদের ভবিষ্যৎ, পরিবার, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক অধিকার–সবকিছুকে ঘিরেই কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
নরউইচে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠক আব্দুল্লাহ আল মামুন আগামীর সময়কে বলেন, আমরা এখানে পরিশ্রম করে জীবন গড়েছি। যদি রিফর্ম ক্ষমতায় আসে আর এই নীতিগুলো বাস্তব হয়, তাহলে আমাদের মতো বহু মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।




