অবৈধ বসতি গড়ে ‘মুছে’ যাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বপ্ন
- ইসরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি পশ্চিমাদের

নতুন ইসরায়েলি বসতি গড়ে উঠলে ভবিষ্যতের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের মানচিত্রই কার্যত দু’টুকরো হয়ে যেতে পারে
মানচিত্রে জায়গাটুকু মাত্র ১২ বর্গকিলোমিটার। কিন্তু সেখানে নতুন ইসরায়েলি বসতি গড়ে উঠলে ভবিষ্যতের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের মানচিত্রই কার্যত দু’টুকরো হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা বহু দিনের। সেই বিতর্কিত ‘ই ১’ অবৈধ বসতি প্রকল্পে ১,২৩৪টি বাড়ি নির্মাণের দরপত্র খুলতেই একজোট হল ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও কানাডা। বৃহস্পতিবার সাত দেশের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অবিলম্বে পরিকল্পনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের সতর্কবার্তা, এই প্রকল্প শুধু দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইসরায়েলের অবস্থানও আরও দুর্বল করবে।
বিতর্কের কেন্দ্রে পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরায়েলি বসতি মালে আদুমিমের মাঝের ‘ই ১’ এলাকা। ইসরায়েলের আবাসন মন্ত্রণালয় সেখানে সাতটি আবাসিক কমপ্লেক্সে ১,২৩৪টি বাড়ি তৈরির জন্য দরপত্র খুলেছে। এগুলো গত বছরের আগস্টে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া মোট ৩,৪০১টি বসতি-ঘরের প্রথম বড় অংশ। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৯ অক্টোবর, যা ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র আট দিন আগে। সমালোচকদের আশঙ্কা, ভোটের আগেই নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেলে পরবর্তী কোনও সরকার ক্ষমতায় এসে প্রকল্প থামাতে চাইলেও তা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।
‘ই ১’ নিয়ে আন্তর্জাতিক আপত্তি নতুন নয়। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রকল্পটি নানা পর্যায়ে থমকে ছিল মূলত আন্তর্জাতিক চাপের কারণে। কিন্তু গত বছর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সরকারের অধীনে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। তখন অর্থমন্ত্রী ও বসতি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমর্থক বেজালেল স্মোত্রিচ প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, এর মাধ্যমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা ‘মুছে ফেলা’ হচ্ছে।
কেন এত আপত্তি? ‘ই ১’-এ বসতি তৈরি হলে মালে আদুমিমের সঙ্গে জেরুজালেমের ইসরায়েলি অবৈধ বসতির ধারাবাহিকতা তৈরি হবে। বিরোধীদের মতে, তাতে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের সরাসরি ভৌগোলিক সংযোগ মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, একই সঙ্গে পূর্ব জেরুজালেমও পশ্চিম তীরের অন্য ফিলিস্তিনি অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুজালেমকে ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দেখতে চান। রামাল্লা, পূর্ব জেরুজালেম ও বেথলেহেমকে ঘিরে একটি সংযুক্ত ফিলিস্তিনি নগরাঞ্চল তৈরির সম্ভাবনাও এতে কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা শান্তিকর্মীদের।
বৃহস্পতিবারের যৌথ বিবৃতিতে সাত দেশ বলেছে, পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। এমন সময়ে নতুন নির্মাণ এগোচ্ছে, যখন পশ্চিম তীরে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ‘নজিরবিহীন’ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং ফিলিস্তিনি অর্থনীতির উপরও গুরুতর বিধিনিষেধ রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। সাত দেশের আহ্বান, “ইসরায়েল সরকার অবিলম্বে এই পরিকল্পনা প্রত্যাহার করুক এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করুক।”
এই বার্তা শুধু ইসরায়েল সরকারের উদ্দেশেই নয়। নির্মাণকাজের দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী সংস্থাগুলোকেও সতর্ক করেছে ওই সাত দেশ। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোনও প্রতিষ্ঠানেরই এই দরপত্রে অংশ নেওয়া উচিত নয়; কারণ তাতে আইনি ও সুনামগত ঝুঁকি, এমনকি আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এর আগেই বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়েছিল ব্রিটেন। বুধবার ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ইসরায়েলের পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও ধ্বংসাত্মক’ বলে নিন্দা করেন এবং লন্ডনে ইসরায়েলের ভারপ্রাপ্ত কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে তলব করেন। তার বক্তব্য, ‘ই ১’-এ নির্মাণ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বুক চিরে যাবে এবং পশ্চিম তীর থেকে পূর্ব জেরুজালেমকে বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি তৈরি করবে।
ইসরায়েল অবশ্য আন্তর্জাতিক সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার বলেছেন, 'ইসরায়েলের ভূমিতে', এই এলাকা-সহ, ইহুদি জনগণের নিজেদের জাতীয় আবাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার ‘ঐতিহাসিক অধিকার’ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, তারা ফিলিস্তিনি 'চরমপন্থাকে' উপেক্ষা করে শুধু ইসরায়েলকেই দায়ী করছে। আন্তর্জাতিক আইনে বসতিগুলোকে অবৈধ বলে অধিকাংশ দেশ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা মনে করলেও ইসরায়েল সেই ব্যাখ্যা মানে না।
ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। পরে ১৯৮০ সালে পূর্ব জেরুজালেমকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করলেও সেই পদক্ষেপ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। ১৯৬৭ সালের পর থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ১৬০টি বসতিতে সাত লাখের মতো ইসরায়েলি ইহুদি বসবাস করছেন। ২০২২ সালের শেষ দিকে নেতানিয়াহুর বর্তমান জোট ক্ষমতায় ফেরার পর এই অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের গতি আরও বেড়েছে।
প্রকল্পটি স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের জীবনেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ইসরায়েলি শান্তি সংগঠন ও ফিলিস্তিনি বেদুইন বাসিন্দারা ইতিমধ্যেই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আদালতে গিয়েছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ‘ই ১’ পরিকল্পনার জন্য নির্ধারিত এলাকায় ১৮টি বেদুইন সম্প্রদায়ের চার হাজারের বেশি মানুষ বাস করেন এবং দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফিলিস্তিনি কর্মী জামাল জুমা বিবিসিকে বলেছেন, প্রকল্পটি তাঁদের পরিবার ও গোটা সম্প্রদায়ের জন্য ‘বিপর্যয়’ ডেকে আনবে।
ইসরায়েলের আবাসন মন্ত্রণালয়ের নতুন দরপত্র তাই কেবল আরও ১,২৩৪টি বাড়ি তৈরির হিসাব নয়। ‘ই ১’-এর কয়েক কিলোমিটার জমির উপরই এখন দাঁড়িয়ে আছে আরও বড় প্রশ্ন, পশ্চিম তীরের মানচিত্রে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য আদৌ কোনও সংযুক্ত ভূখণ্ড থাকবে কি না। সেই কারণেই বহু বছরের আপত্তি পেরিয়ে নির্মাণের কাজ বাস্তবের আরও কাছে আসতেই একসঙ্গে কড়া বার্তা দিল ইউরোপের ছয় দেশ ও কানাডা।






