কেন চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে ব্রিটেনে?

ছবি: রয়টার্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে কাজে লাগিয়ে খরচ কমানো ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গিয়ে ব্রিটেনের চাকরির বাজার যেন এখন দুই ভিন্ন গতিতে ছুটছে। এক দিকে অভিজ্ঞ এবং এআই-দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ বাড়াচ্ছে সংস্থাগুলো, অন্য দিকে খুচরা ব্যবসা, উৎপাদন, হিসাবরক্ষণ ও বিপণন-সহ বহু পেশায় কমছে শূন্যপদ। রবিবার (২ আগস্ট) প্রকাশিত ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে চাকরি অনুসন্ধান সংস্থা ইনডিডের সাম্প্রতিক তথ্য উদ্ধৃত করে এই প্রবণতার কথা বলা হয়েছে।
ইনডিডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে ব্রিটিশ সংস্থাগুলোর মোট চাকরির বিজ্ঞাপন ২০২৫ সালের জানুয়ারির তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম। কিন্তু এই সামগ্রিক পতনের আড়ালে রয়েছে তীব্র বৈষম্য। সফ্টওয়্যার ডেভেলপারদের জন্য চাকরির বিজ্ঞাপন ১৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে এই বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে জ্যেষ্ঠ পদ এবং সরাসরি এআই-সংশ্লিষ্ট ভূমিকায়।
ইনডিডের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জ্যাক কেনেডি ব্লুমবার্গকে বলেছেন, “ব্রিটেনের চাকরিবাজার ক্রমশ দুই গতিতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। চাহিদা এখন অভিজ্ঞ কর্মী এবং সরাসরি এআই-সংশ্লিষ্ট ভূমিকায় কেন্দ্রীভূত হচ্ছে; পুরো পেশাজুড়ে সমানভাবে ছড়াচ্ছে না।”
তথ্য বলছে, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রকৌশলের মতো যেসব পেশায় এআই নিয়মিত কাজের একটি অংশ নিজের হাতে নিয়ে অভিজ্ঞ কর্মীর মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে, সেসব ক্ষেত্র গত গ্রীষ্মের তুলনায় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু যেখানে মানুষের কাজ সরাসরি প্রতিস্থাপিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি, যেমন হিসাবরক্ষণ বা বিপণন, সেখানে শূন্যপদে দুই অঙ্কের পতন দেখা যাচ্ছে। খুচরা ব্যবসা ও উৎপাদন ক্ষেত্রেও নিয়োগের গতি কমেছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে উৎপাদন খাতে। ২০২২ সালের জুনের তুলনায় উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট চাকরির বিজ্ঞাপন ৫৮ শতাংশ কমেছে; গত গ্রীষ্মের তুলনায়ও তা ১৮ শতাংশ নিচে। স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ, মাল ওঠানো-নামানো, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং নির্মাণ ক্ষেত্রের নিয়োগও এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
এমন পরিস্থিতিতে প্রথম চাকরি খুঁজছেন যাঁরা, কর্মজীবনে ফিরতে চাইছেন যাঁরা অথবা পেশা বদলাতে চান, তাঁদের জন্য দরজা আরও সরু হয়ে আসছে। কেনেডির কথায়, “বিশেষত কর্মজীবনের শুরুতে থাকা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য যোগ্যতার মানদণ্ড ক্রমেই উঁচু হচ্ছে। কারণ চাকরিবাজারের শক্তিশালী অংশগুলো এখন হয় বিশেষায়িত এআই দক্ষতা, নয়তো দীর্ঘ অভিজ্ঞতা চাইছে।”
এই প্রবণতা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের যুব কর্মসংস্থান পরিকল্পনার সামনেও প্রশ্ন তুলেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, এআই হয়তো একটি প্রবন্ধ লিখতে পারে, কিন্তু ট্রেন তৈরি করতে পারে না। তাঁর সরকার তরুণদের কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দিকে আরও বেশি নিয়ে যেতে চাইছে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ঘোষিত পরিকল্পনায় ২২ হাজারের বেশি অতিরিক্ত কলেজ আসন, সর্বোচ্চ ৪,৫০০ পাউন্ডের শিক্ষানবিশ ভাতা এবং প্রায় ১৮০টি ‘ইয়ুথ হাব’ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হল, যে নীলকলার পেশাগুলোকে তুলনামূলকভাবে এআই-নিরাপদ ভাবা হচ্ছিল, সেখানেও নিয়োগ শ্লথ। ফলে শুধু কারিগরি প্রশিক্ষণ বাড়ালেই যে তরুণদের দ্রুত চাকরি মিলবে, তার নিশ্চয়তা নেই। ইতিমধ্যেই ব্রিটেনে যুব বেকারত্ব এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি এই পরিস্থিতিকে “কম নিয়োগ, কম ছাঁটাই” অর্থনীতির ফল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সরকারি এক মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, এআই ব্রিটেনের শ্রমবাজারে একই সঙ্গে কাজ প্রতিস্থাপন ও কাজের মান বাড়ানোর প্রভাব ফেলতে পারে; কোন পেশায় কোন প্রভাবটি বেশি হবে, তা নির্ভর করবে নির্দিষ্ট কাজের ধরন, দক্ষতা ও প্রযুক্তি গ্রহণের গতির ওপর।
অর্থাৎ, এআই আপাতত ব্রিটেনের সব চাকরি একসঙ্গে কেড়ে নিচ্ছে না। বরং চাকরির বাজারে তৈরি করছে নতুন এক শ্রেণিবিভাগ–যাঁদের হাতে প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা আছে, তাঁদের মূল্য বাড়ছে; আর যাঁরা দরজায় প্রথম কড়া নাড়ছেন, তাঁদের সামনে সেই দরজাই ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে।






