যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা কমাতে নিজস্ব অস্ত্র তৈরিতে মন দিচ্ছে ইউরোপ

ইউক্রেন যুদ্ধে সস্তা ড্রোনের ব্যবহার রণক্ষেত্রের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ছবি : সংগৃহীত।
ইংল্যান্ডের ইস্ট মিডল্যান্ডসের একটি ছোট্ট ওয়ার্কশপ। সেখানে দিনরাত চলছে থ্রিডি প্রিন্টার। তৈরি হচ্ছে ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের কাঠামো। আর দক্ষ প্রকৌশলীরা হাতে হাতে জুড়ে দিচ্ছেন মোটর ও নেভিগেশন চিপ।
ব্রিটিশ স্টার্টআপ স্কাইকাটারের এ দৃশ্য এখন ইউরোপের অনেক দেশেরই সাধারণ চিত্র। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন তারা নিজেরা ঘরোয়া অস্ত্র তৈরিতে মন দিয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে সস্তা ড্রোনের ব্যবহার রণক্ষেত্রের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আকাশপথে হামলা এড়াতে সামনের সারির সেনাদের এখন প্রতিনিয়ত জায়গা বদলাতে হচ্ছে। ড্রোন থেকে বাঁচতে নেট লাগানো টানেল বা রেডিও জ্যামিং এড়াতে ফাইবার অপটিক কেব্ল ব্যবহার করা হচ্ছে।
শহরগুলোতে এখন হানা দিচ্ছে এমন সব গাইডেড মিসাইল, যেগুলো আগের চেয়ে অনেক সস্তা।
এতদিন ইউরোপের দেশগুলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের ন্যাটোর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর চাপের কারণে সেই নির্ভরতায় ফাটল ধরেছে।
ইউরোপীয় নেতারা এখন বুঝতে পারছেন, আমেরিকার ওপর অতি নির্ভরশীলতা তাদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এই ‘প্রতিরক্ষা সার্বভৌমত্ব’ অর্জনের লক্ষ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগামী চার বছরে ৮০০ বিলিয়ন ইউরো খরচ করার পরিকল্পনা করেছে। যুক্তরাজ্যও তাদের বাজেট বাড়িয়েছে। যদিও দেশীয় নির্বাচনের ধাক্কায় প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কিছুটা চাপের মুখে আছেন। তবুও প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
এতদিন ইউরোপের দেশগুলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের ন্যাটোর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সেই নির্ভরতায় ফাটল ধরেছে।
আধুনিক যুদ্ধের নতুন কৌশল সম্পর্কে ব্রিটিশ সেনাপ্রধান জেনারেল স্যার রোলি ওয়াকার জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর মোট সরঞ্জামের মাত্র ২০ শতাংশ হবে বড় ও ভারী। আর বাকি ৮০ শতাংশ হবে সস্তা ড্রোন। যেটি হবে একবার ব্যবহারযোগ্য।
এদিকে, রাশিয়ায় ব্যবহৃত ইরানের শাহেদ ড্রোনের দাম মাত্র ৩০ হাজার ডলার। অথচ এই ড্রোনগুলো ধ্বংস করতে ন্যাটো যে মিসাইল ব্যবহার করে, সেগুলোর একেকটির দাম কয়েক লাখ থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। এই অসম সমীকরণ মেলাতে ইউরোপের স্টার্টআপগুলো এখন সস্তায় ড্রোন ধ্বংসকারী মিসাইল তৈরিতে মন দিয়েছে।
স্কাইকাটার বলছে, তাদের তৈরি ইন্টারসেপ্টর মাত্র ২ হাজার ডলারে তৈরি করা সম্ভব।
ইউরোপে এখন বেশ কিছু বিলিয়ন ডলার মূল্যের কোম্পানি ডিফেন্স স্টার্টআপ গড়ে উঠেছে। জার্মানির হেলসিং, পর্তুগালের টেকেভার কিংবা ব্রিটিশ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা কেমব্রিজ অ্যারোস্পেস এখন প্রথাগত বড় কোম্পানিগুলোর বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
তবে একটি বড় সমস্যা হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। যুদ্ধের ময়দানে ড্রোনের প্রযুক্তি প্রতি সপ্তাহে বদলাচ্ছে। কিন্তু সরকারিভাবে সেই ড্রোন কেনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর।
স্কাইকাটারের এক পরিচালক আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘আমরা সরকারের দরজায় কড়া নাড়ছি, কিন্তু প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঝুলে থাকায় কোনো টাকা আসছে না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের হয়তো ইংল্যান্ড ছেড়ে অন্য দেশে চলে যেতে হবে।’
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান।






