ফ্রান্সজুড়ে সঙ্গীতের উচ্ছ্বাস, পথে পথে মানুষের ঢল

প্যারিসের ঐতিহাসিক রিপাবলিক চত্বরে বিশ্ব সঙ্গীত উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষের ভিড়। তীব্র তাপদাহ উপেক্ষা করে রাতভর চলে সঙ্গীত পরিবেশনা।
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহ এবং আবহাওয়া দপ্তরের 'অরেঞ্জ অ্যালার্ট' উপেক্ষা করেই ফ্রান্সজুড়ে অত্যন্ত উদ্দীপনার সাথে উদযাপিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী বিশ্ব সঙ্গীত উৎসব ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’। ২১ জুন উত্তর গোলার্ধের দীর্ঘতম দিনের সন্ধ্যায় রাজধানী প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও পর্যটন এলাকায় হাজারো শিল্পী ও লাখো দর্শকের অংশগ্রহণে এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। গরমের চূড়ান্ত পারদ চড়লেও উৎসবের পারদ ছিল তুঙ্গে, যা ফরাসিদের চিরন্তন শিল্প ও সঙ্গীতপ্রেমেরই অনন্য প্রমাণ।
চলতি জুন মাসজুড়ে ফ্রান্সের ৫৩টিরও বেশি অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকায় তীব্র তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি ছিল। অতিরিক্ত গরমের কারণে প্যারিসের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুরের পরের ক্লাস বর্জন এবং স্কুল ছুটির মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে জলবায়ুজনিত এই চরম চ্যালেঞ্জ এবং প্রশাসনের সর্বোচ্চ সতর্কতা নির্দেশনার মাঝেও সুরের টানে রাজপথে মানুষের ঢল ঠেকানো যায়নি। দর্শকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে উৎসবের সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিনামূল্যে পর্যাপ্ত পানীয় জল সরবরাহ, প্রাথমিক চিকিৎসা বুথ ও বিশেষ স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনার ব্যবস্থা রাখা হয়। প্রচণ্ড গরমে বেশ কিছু মানুষ সাময়িক অসুস্থতা ও পানিশূন্যতায় ভুগলেও বড় ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে উৎসবটি।
ফরাসি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ১৯৮২ সালে যাত্রা শুরু করা এই উৎসব বর্তমানে বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশে পালিত হয়। প্রতি বছর ২১ জুন আয়োজিত এই উৎসবের মূল লক্ষ্য হলো সঙ্গীতকে চার দেয়ালের বাইরে এনে উন্মুক্ত পরিসরে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এ উপলক্ষে পেশাদার ও অপেশাদার শিল্পীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।
প্যারিসের ঐতিহাসিক চত্বর, বিখ্যাত স্কয়ার, পার্ক, ক্যাফে ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে দিনভর এবং রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে সঙ্গীত পরিবেশনা। জ্যাজ, রক, পপ, শাস্ত্রীয়, লোকসঙ্গীত, র্যাপ, ইলেকট্রনিক এবং বিশ্বসঙ্গীতসহ বিভিন্ন ধারার শিল্পীরা অংশ নেন এতে। উৎসব উপলক্ষে প্যারিস, লিয়ঁ, মার্সেই, তুলুজ, লিল, স্ট্রাসবুর্গ ও বোর্দোর মতো বড় শহরগুলোতে রেকর্ডসংখ্যক জনসমাগম দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি স্পেন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিপুলসংখ্যক পর্যটক এই উৎসবে শামিল হন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার ও ছবি প্রকাশের মাধ্যমে উৎসবের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন বিশ্ববাসীর সঙ্গে।
এবারের আয়োজনে বাংলাদেশি কমিউনিটির উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্যারিস অঞ্চলের ও-বার-ভিয়ে, লা কুরনেভ এবং গার দ্য নর এলাকায় পৃথকভাবে বসেছিল বাংলা গানের আসর। ও-বার-ভিয়ে এলাকায় এসকে সাউন্ডের উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে মঞ্চ কাঁপান বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘জলের গান’-এর প্রধান কণ্ঠশিল্পী রাহুল আনন্দ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি ভিনদেশি সঙ্গীতপ্রেমীরাও পরম তৃপ্তিতে উপভোগ করেন বাংলার মাটির গান। দূর পরবাসে মাটির টানে প্রবাসীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবের আমেজকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
ফরাসি সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা এবং চলমান তীব্র জলবায়ুজনিত চ্যালেঞ্জের সময়েও ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সামাজিক সংযোগ ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা এ উৎসব আজ ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ জনসম্পৃক্ত সাংস্কৃতিক আয়োজনে পরিণত হয়েছে।







