অসুস্থ তবু সিংহাসন ছাড়তে নারাজ ইউরোপের প্রবীণতম রাজা
- রক্তের রোগের চিকিৎসায় শরীরে জমেছে অতিরিক্ত তরল
- সোমবার বিকেলে অসলোতে ভর্তি ৮৯ বছরের রাজা পঞ্চম হ্যারাল্ড

স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর অসলো ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে নরওয়ের রাজা পঞ্চম হ্যারাল্ডকে।
বয়স ৮৯। তবু রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা কখনও ভাবেননি। বারবার অসুস্থ হয়েছেন, হাসপাতালেও যেতে হয়েছে একাধিকবার। এ বার ফের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে নরওয়ের রাজা পঞ্চম হ্যারাল্ড। সোমবার বিকেলে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাকে অসলো ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহ তিনি রাজকীয় দায়িত্ব থেকে ছুটিতে থাকবেন। এই সময়ে রাজার সাংবিধানিক দায়িত্ব সামলাবেন তাঁর ছেলে যুবরাজ হকন।
নরওয়ের রাজপ্রাসাদ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হ্যারাল্ড হেমোলাইটিক অ্যানিমিয়া নামে রক্তের একটি রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। এ রোগে শরীরের লোহিত রক্তকণিকা স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত ভেঙে যায়। চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাকে কর্টিসোন দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু সেই চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শরীরে অতিরিক্ত তরল জমতে শুরু করে। সোমবার স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, হাসপাতালে রেখে তাঁর চিকিৎসা প্রয়োজন।
রাজপ্রাসাদের বিবৃতিতে রাজার বর্তমান অবস্থাকে গুরুতর বলে বর্ণনা করা হয়নি। তবে ঠিক কত দিন তাকে হাসপাতালে থাকতে হবে, তা এখনও জানানো হয়নি। আপাতত দুই সপ্তাহের অসুস্থতাজনিত ছুটি দেওয়া হয়েছে। তার অনুপস্থিতিতে যুবরাজ হকন রিজেন্ট বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। রাজপরিবারের নির্ধারিত কর্মসূচিতে কী পরিবর্তন আসবে, তা পরে জানানো হবে।
হ্যারাল্ড গত ফেব্রুয়ারিতে ৮৯ বছরে পা দেন। বর্তমানে তিনি ইউরোপের সবচেয়ে বেশি বয়সী জীবিত রাজা। বাবা রাজা পঞ্চম ওলাভের মৃত্যুর পর ১৯৯১ সালে নরওয়ের সিংহাসনে বসেন তিনি। বয়স ও একের পর এক স্বাস্থ্যসমস্যা সত্ত্বেও দায়িত্ব ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। ২০২৪ সালে ডেনমার্কের রানি দ্বিতীয় মারগ্রেথ সিংহাসন ছাড়ার পর হ্যারাল্ডকে একই প্রশ্ন করা হয়েছিল। তখন তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, নরওয়ের পার্লামেন্টের কাছে যে শপথ নিয়েছেন, তা আজীবনের।
তবে গত কয়েক বছর ধরে তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি স্ত্রী রানি সোনজার সঙ্গে ব্যক্তিগত সফরে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের টেনেরিফে থাকাকালে হ্যারাল্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। পায়ের ত্বকে সংক্রমণ ও পানিশূন্যতার কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। দুদিন চিকিৎসার পর হাসপাতাল ছাড়েন তিনি।
এর আগেও বিদেশ সফরে অসুস্থ হওয়ার নজির রয়েছে। ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় ছুটি কাটানোর সময় সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন হ্যারাল্ড। হৃদ্স্পন্দন কমে যাওয়ায় সেখানে তাঁর শরীরে সাময়িক পেসমেকার বসানো হয়। পরে বিশেষ চিকিৎসাবিমানে দেশে ফিরিয়ে এনে অসলোতে স্থায়ী পেসমেকার বসানো হয়।
স্বাস্থ্যসমস্যার তালিকা আরও পুরোনো। ২০০৩ সালে তার মূত্রাশয় থেকে ক্যানসারের টিউমার অপসারণ করা হয়েছিল। হৃদ্যন্ত্রের ভাল্ভজনিত সমস্যায়ও অস্ত্রোপচার হয়েছে। ২০২০ সালে তার হৃদ্যন্ত্রের একটি ভাল্ভ প্রতিস্থাপন করা হয়। হাঁটুর অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন সংক্রমণের কারণেও গত কয়েক বছরে একাধিকবার হাসপাতালে যেতে হয়েছে তাঁকে।
শুধু রাজা নন, চলতি বছর স্বাস্থ্য নিয়ে কঠিন সময় পার করছে নরওয়ের পুরো রাজপরিবার। রানি সোনজা গত মে মাসে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার কারণে অল্প সময়ের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আর যুবরাজ হকনের স্ত্রী যুবরাজ্ঞী মেটে-মারিট দীর্ঘদিন ধরে পালমোনারি ফাইব্রোসিসে ভুগছিলেন। গত ১৭ জুন অসলো ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে তাঁর সফল ফুসফুস প্রতিস্থাপন হয়। প্রায় এক মাস হাসপাতালে থাকার পর ১৪ জুলাই তিনি বাড়ি ফেরেন এবং এখনও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে দুই সপ্তাহের জন্য রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়া যুবরাজ হকনের উপরও চাপ বাড়বে। কারণ স্ত্রীর দীর্ঘ পুনর্বাসনপর্বে পরিবারের পাশে থাকার জন্য তাঁর সরকারি কর্মসূচিও আগেই কিছুটা সামঞ্জস্য করা হয়েছিল। এখন বাবার অসুস্থতার কারণে তাঁকেই একই সঙ্গে রাজকীয় ও সাংবিধানিক দায়িত্ব সামলাতে হবে।
নরওয়ের রাজা হিসেবে হ্যারাল্ডের ভূমিকা মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক। কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দেশটির রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার পরিচিত মুখ। বয়স যত বেড়েছে, স্বাস্থ্য তাঁকে বারবার থামিয়েছে; তবু সিংহাসন ছাড়ার প্রশ্নে তাঁর উত্তর বদলায়নি।
এ বারও হাসপাতালের শয্যা সাময়িকভাবে রাজপ্রাসাদের কর্মসূচি থেকে তাকে দূরে রাখল। কিন্তু ৮৯ বছরের হ্যারাল্ডের দীর্ঘ রাজজীবনের পরিচিত ছবিটাই যেন আবার ফিরে এল, শরীর বিশ্রাম চাইছে, দায়িত্ব আপাতত ছেলের হাতে অথচ মুকুট ছেড়ে দেওয়ার কথা এখনও তাঁর ভাবনায় নেই।






