আগামীর সময়

আফগান তালেবান যেভাবে পাকিস্তানের শত্রু হলো

আফগান তালেবান যেভাবে পাকিস্তানের শত্রু হলো

সংগৃহীত ছবি

বহু বছর ধরে আফগান তালেবানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল পাকিস্তান। ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কৌশলগত গভীরতা বজায় রাখতে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ইসলামাবাদের মদদে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি। কিন্তু এত বছর বাদে কীভাবে তারা একে অপরের শত্রু হয়ে উঠল?

সোমবার রাতে কাবুলে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা লড়াইয়ের সর্বশেষ ঘটনা এটি।

আফগান তালেবান জানিয়েছে, একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চালানো এই হামলায় অন্তত ৪০০ জন নিহত এবং ২৫০ জন আহত হয়েছে। তবে পাকিস্তান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, তারা সামরিক স্থাপনা ও সন্ত্রাসী সহায়তাকারী অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গত মাসে দেওয়া বক্তব্যে দুই দেশের উত্তেজনাকে ‘ওপেন ওয়ার’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তার মতে, দুই মুসলিম প্রতিবেশীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান এই উত্তেজনা ‘ওপেন ওয়ারের’ সমতুল্য।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে উগ্রপন্থী লক্ষ্যবস্তুগুলোতে বিমান হামলা শুরু করে।

পরবর্তীতে সেই মাসেই আফগানিস্তানের প্রধান শহরগুলোতে একাধিক বিমান হামলা চালায় ইসলামাবাদ। সীমান্ত বরাবর বিভিন্ন সেক্টরে তালেবানের সামরিক পোস্ট, সদর দপ্তর এবং গোলাবারুদের ডিপোতে চালানো এই আকাশ ও স্থল হামলা মূলত পাকিস্তানি সীমান্ত বাহিনীর ওপর আফগানিস্তানের হামলার প্রতিক্রিয়ায় করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এর আগে, গত অক্টোবর মাসে দুই দেশের সীমান্ত সংঘর্ষে ডজনখানেক সৈন্য নিহত হয়েছিল। পরবর্তীতে তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় সেই সংঘাতের অবসান ঘটে। তখন একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা পরে ভেঙে যায়।

এই ক্রমবর্ধমান সংঘাতে মূল প্রশ্ন হলো কেন এই প্রতিবেশীরা এখন দ্বন্দ্বে লিপ্ত?

২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনকে পাকিস্তান স্বাগত জানিয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একে ‘আফগানরা দাসত্বের শিকল ভেঙেছে’ বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু ইসলামাবাদ খুব তাড়াতাড়িই বুঝতে পারে তালেবানরা তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী অতটাও সহযোগী মনোভাবের নয়।

ইসলামাবাদের দাবি, উগ্রপন্থী গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) নেতারা ও অনেক যোদ্ধা আফগানিস্তানে অবস্থান করছে। এছাড়া পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবিদার সশস্ত্র বিদ্রোহীরাও আফগানিস্তানকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে।

গ্লোবাল মনিটরিং সংস্থা 'আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার’ তথ্যমতে, ২০২২ সাল থেকে টিটিপি ও বেলুচ বিদ্রোহীদের হামলার হার প্রতি বছরই বাড়ছে। অন্যদিকে কাবুল বারবার অস্বীকার করেছে যে তারা পাকিস্তানি ভূখণ্ডে হামলার জন্য আফগান মাটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে।

আফগান তালেবানের দাবি, পাকিস্তান তাদের শত্রু পক্ষ— ইসলামিক স্টেটের (আইএস) যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে, যা ইসলামাবাদ অস্বীকার করে আসছে। ইসলামাবাদ বলছে, আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে ক্রমাগত উগ্রপন্থী হামলার কারণে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরপর থেকে বারবার সংঘর্ষ ও সীমান্ত বন্ধের ফলে এই দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে বাণিজ্য ও যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত কীসের?

ফেব্রুয়ারির হামলার আগের দিন পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছিল, আফগানিস্তানের উগ্রপন্থীরাই সাম্প্রতিক সময়ের আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং পাকিস্তানি সামরিক ও পুলিশ বাহিনীকে লক্ষ্য করে চালানো হামলার মদদদাতা। এ বিষয়ে তাদের কাছে ‘অকাট্য প্রমাণ’ আছে। সূত্রগুলো ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে সাতটি পরিকল্পিত বা সফল হামলার তালিকা দিয়েছে, যা আফগানিস্তানের সঙ্গে জড়িত বলে তাদের দাবি।

পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রের মতে, বাজাউর জেলায় এক হামলায় ১১ নিরাপত্তা কর্মী ও দুই বেসামরিক নাগরিক নিহতের ঘটনায় এক আফগান জড়িত ছিল। টিটিপি এই হামলার দায় স্বীকার করেছে।

পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) কারা?

২০০৭ সালে উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে সক্রিয় বেশ কয়েকটি উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে টিটিপি গঠিত হয়। এটি সাধারণত পাকিস্তানি তালেবান নামে পরিচিত।

বাজার, মসজিদ, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও পুলিশ স্টেশনে হামলা চালিয়েছে টিটিপি। এমনকি তারা সীমান্তের পাশাপাশি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সোয়াত উপত্যকাতেও ভূখণ্ড দখল করেছিল। এই গোষ্ঠীটিই ২০১২ সালে স্কুলছাত্রী মালালা ইউসুফজাইয়ের ওপর হামলায় জড়িত ছিল।

টিটিপি আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে তালেবানের হয়ে যুদ্ধ করেছে এবং পাকিস্তানে আফগান যোদ্ধাদের আশ্রয়ও দিয়েছে। পাকিস্তান নিজের মাটিতে টিটিপির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে সীমিত সাফল্য পেয়েছে। যদিও ২০১৬ সালে শেষ হওয়া একটি অভিযানে কয়েক বছর আগে হামলা অনেক কমে গিয়েছিল।

ভবিষ্যৎ কী?

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান তাদের সামরিক অভিযান আরও তীব্র করতে পারে। অন্যদিকে কাবুল সীমান্ত পোস্টে হানা দিয়ে বা নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে আরও আন্তঃসীমান্ত গেরিলা হামলা চালিয়ে এর প্রতিশোধ নিতে পারে।

উভয় দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকা চীনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবেশী অঞ্চলে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই উত্তেজনা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

কাগজে-কলমে দুই পক্ষের সামরিক সক্ষমতায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। ১ লাখ ৭২ হাজার সদস্য নিয়ে তালেবান বাহিনীর শক্তি পাকিস্তানের জনবলের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। তালেবানের অন্তত ৬টি উড়োজাহাজ ও ২৩টি হেলিকপ্টার থাকলেও সেগুলোর অবস্থা অজানা। তাদের কোনো যুদ্ধবিমান বা কার্যকর বিমানবাহিনী নেই।

অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীতে ৬ লাখের বেশি সক্রিয় সদস্য, ৬, হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান ও চার শতাধিক যুদ্ধবিমান রয়েছে। এছাড়া দেশটি পরমাণু শক্তিধর।

    শেয়ার করুন: