ট্রাম্পের চীন সফরের আগে আকাশ ছুঁই ছুঁই চাইনেক্স সূচক

সংগৃহীত ছবি
চীনের প্রযুক্তিনির্ভর চাইনেক্স সূচক বুধবার পৌঁছেছে সর্বকালের সর্বোচ্চ অবস্থানে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের আগে বিনিয়োগকারীদের আশা বৃদ্ধির মধ্যে ৪ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করে বন্ধ হয়েছে সূচকটি।
শেনজেনের নাসডাক-ধাঁচের চাইনেক্স বোর্ডে তালিকাভুক্ত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এই সূচকটি লেনদেন শেষে ৪ হাজার ৩৮ দশমিক ৩৩ পয়েন্টে পৌঁছায়, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ সমাপনী অবস্থান। শক্তিশালী উত্থান দেখিয়েছে চীনের অন্যান্য শেয়ার সূচকও। ২০১৫ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে সাংহাই কম্পোজিট সূচক।
কয়েক মাস ধরেই ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে চীনের শেয়ারবাজার। বিভিন্ন খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক শক্তিকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকরা। আর ট্রাম্পের আসন্ন সফর শেয়ারবাজারে অতিরিক্ত গতি যোগ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা প্রশমনে একটি চুক্তির আশা করছেন কিছু বিনিয়োগকারী।
বুধবার চীনে পৌঁছানোর কথা রয়েছে ট্রাম্পের। তার সঙ্গে থাকবেন এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং, অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক এবং টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কসহ কয়েকজন মার্কিন প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহী।
বুধবারের এক নোটে মরগ্যান স্ট্যানলি জানিয়েছে, উন্নত আয় এবং বৈশ্বিক আপস্ট্রিম সরবরাহ শৃঙ্খলে ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের ভিত্তিতে ২০২৭ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক নাগাদ ‘মধ্যমমাত্রার ঊর্ধ্বগতি’ দেখা যেতে পারে চীনের শেয়ারবাজারে।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, চলতি সপ্তাহের যুক্তরাষ্ট্র-চীন শীর্ষ সম্মেলনে যদি নভেম্বর মাসে হওয়া এক বছরের ‘বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি’ বাড়ানোর ঘোষণা আসে, তাহলে তা ‘মধ্যমমাত্রার ঊর্ধ্বগতি’ সৃষ্টি করতে পারে সূচকে।
ইউবিএসের চীনবিষয়ক শেয়ার কৌশলবিদ মেং লেইও একমত পোষণ করে বললেন, চাইনেক্স সূচকের উত্থানের মূল কারণ ছিল তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর দ্রুত আয় বৃদ্ধি।
ব্যাটারি নির্মাতা কনটেম্পোরারি অ্যাম্পেরেক্স টেকনোলজি লিমিটেড (সিএটিএল) এবং অ্যাপলের সরবরাহকারী লেন্স টেকনোলজিসহ চীনের বেশ কয়েকটি শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এই সূচকে।
সোমবারের এক বৈঠকে মেং বললেন, ‘আমরা দেখেছি ২০২৫ সালে চাইনেক্সভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় ২১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে এবং ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে তা আরও বেড়ে পৌঁছেছে ২২ দশমিক ৭ শতাংশে।’
তিনি জানান, সরাসরি বাজারের পারফরম্যান্সে প্রতিফলিত হয়েছে এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা।
বুধবার লেনদেন শেষে সিএটিএলের শেয়ার ০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং লেন্সের শেয়ার ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। চাইনেক্স সূচকে সবচেয়ে বেশি উত্থান হয়েছে চিপ নির্মাতা ম্যাক্সসেন্ড মাইক্রোইলেকট্রনিকস কোম্পানির, যার শেয়ার ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর আরেকটি চীনা সূচক—এসএসই স্টার ৫০, যা সাংহাইয়ের নাসডাক-ধাঁচের স্টার মার্কেটে তালিকাভুক্ত ৫০টি বৃহত্তম শেয়ার অনুসরণ করে—সেটিও বুধবার সর্বকালের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। সূচকটি বন্ধ হয়েছে ১ হাজার ৭৭০ দশমিক ১৫ পয়েন্টে।
২০১৯ সালে চালু হওয়া এই বোর্ডে চীনের শীর্ষ সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর কয়েকটি রয়েছে, যেমন চিপ নির্মাতা সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন এবং গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট ডিজাইনার ক্যামব্রিকন টেকনোলজিস।
হংকংয়ে তালিকাভুক্ত ৩০টি বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানিকে প্রতিনিধিত্বকারী হ্যাংসেং টেক সূচক বুধবার ০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে বন্ধ হয়েছে। আলিবাবা ও টেনসেন্ট হোল্ডিংস এই সূচকের অন্তর্ভুক্ত।
এইচএসবিসি বুধবারের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এপ্রিল থেকে চাইনেক্স ও স্টার ৫০ বৈশ্বিকভাবে শীর্ষ পারফরমারগুলোর মধ্যে রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের উদ্বেগকে উপেক্ষা করেছে। ব্যাংকটি বলেছে, অনুকূল মূল্যায়ন, উন্নত আয়ের গতি এবং বাজারে পর্যাপ্ত তারল্যের কারণে প্রবৃদ্ধিনির্ভর শেয়ারের ভালো পারফরম্যান্স অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছে তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এই সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে এবং বাজারে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।’
চীন এপ্রিল মাসে চাইনেক্সে বড় ধরনের সংস্কার ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে লাভজনক হওয়ার আগেই বোর্ডে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, উদীয়মান খাতের কোম্পানিগুলো যদি অন্তত ৩ বিলিয়ন ইউয়ান (৪৩ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার) বাজারমূল্য এবং ২০ কোটি ইউয়ানের বেশি আয় দেখাতে পারে, তাহলে তারা প্রাথমিক শেয়ার ছাড়ের আবেদন করতে পারবে।
এই পদক্ষেপ ১৬ বছর পুরনো বোর্ডটির বৃহত্তর সংস্কারের অংশ, যার লক্ষ্য অস্থিরতা কমানো এবং আরও বিস্তৃত বিনিয়োগকারী আকর্ষণ করা।
চীন সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশন জানিয়েছে, চাইনেক্স-সংযুক্ত এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড ও অপশনের পরিধি বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট সূচক ফিউচারও চালু করবে তারা।
এইচএসবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব পরিবর্তনের ফলে চাইনেক্স বোর্ড ‘স্টার বোর্ডের তুলনায় উদ্ভাবনী কোম্পানিগুলোর জন্য আরও আকর্ষণীয়’ হয়ে উঠতে পারে। ব্যাংকটি আশা করছে, প্রতিষ্ঠানের বাড়তি উপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি মূলধন ও বিদেশি তহবিলের প্রবাহ বাড়াবে এবং সূচকের আরও পুনর্মূল্যায়নে সহায়তা করবে চাইনেক্স বোর্ডে উচ্চপ্রযুক্তি।




