আগামীর সময়

দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের যুদ্ধ

দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের যুদ্ধ

২০২১ সালে তালেবানের আক্রমণে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আফগানিস্তানের হাতে। এর কয়েক সপ্তাহ পর, পাকিস্তানের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান আলোচনার জন্য রাজধানী কাবুলে গিয়ে বলেন, ‘চিন্তা করবেন না, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।’ তৎকালীন দায়িত্বে থাকা একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ তথ্য জানিয়েছেন।


তবে পাঁচ বছর পর চিত্র ভিন্ন। যাকে দীর্ঘদিন ধরে তালেবানের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখেছে—এখন ইসলামপন্থি গোষ্ঠীটির সঙ্গে সবচেয়ে তীব্র লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে ইসলামাবাদ। যা পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ শুক্রবার ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ ঘোষণার পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়েছে।

এই অস্থিরতার অর্থ হলো— উপসাগর থেকে হিমালয় পর্যন্ত এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখন অস্থিরতা বিরাজ করছে। একই সময়ে আফগানিস্তানের প্রতিবেশী ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক মোতায়েন জোরদার করছে, আর গত মে মাসে চার দিনের যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান ও তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সম্পর্ক এখনো উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে।


আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে— আফগান তালেবান দক্ষিণ এশীয় দেশটির অভ্যন্তরে তাণ্ডব চালানো তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)সহ বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীকে সমর্থন জোগাচ্ছে এমন অভিযোগ পাকিস্তানের।

পূর্বে একসঙ্গে লড়াই করা আফগান তালেবান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তার অভ্যন্তরীণ সমস্যা।

আজ শনিবার রয়টার্সে প্রকাশিত আরিবা শহিদের বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ মতবিরোধ উভয় পক্ষের দৃঢ় ও পরস্পরবিরোধী অবস্থানের প্রতিফলন। পাকিস্তান কয়েক দশকের সমর্থনের পর তালেবানের কাছ থেকে আনুগত্য আশা করেছিল, কিন্তু তালেবান নিজেকে ইসলামাবাদের কাছে দায়বদ্ধ মনে করেনি।

পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আফগানিস্তান বিশেষজ্ঞ জেনিফার ব্রিক মুরতাজাশভিলি বলেন, ‘সম্পর্কটি বাস্তবে কেমন হবে, তা নিয়ে কোনো পক্ষই বিশ্বস্ত নিয়ে আলোচনা করেনি। এই কাঠামোগত ভুলবোঝাবুঝিই পরবর্তী সবকিছুর সূত্রপাত।’

গত অক্টোবরের সংঘর্ষের পর কয়েক মাস ধরে ২,৬০০ কিলোমিটার (১,৬১৫ মাইল) দীর্ঘ দুর্গম সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করলেও শুক্রবারের লড়াইটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ আশ্রয় দেওয়া লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ না থেকে তালেবানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানতে যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরীর মতে, এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রাজধানী কাবুলসহ দেশের গভীরে অবস্থিত স্থাপনা এবং তালেবান সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার আসন দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কান্দাহারও রয়েছে। এই সংঘর্ষ খুব নিকটবর্তী সময়ে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জঙ্গিবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ বিশেষজ্ঞ আবদুল বাসিত বলেন, ‘আমরা এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে প্রবেশ করেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যা দেখছি— সামনে অস্থিরতার অপেক্ষা করছে। যার ফলে আরো সহিংসতা হবে, আরো উত্তেজনা বাড়বে। আর বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো শক্তি সঞ্চয় করবে।’

‘পাকিস্তানের জন্য এক দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতি’

পরমাণু অস্ত্রধারী পাকিস্তানের রয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় সামরিক সদস্যের একটি শক্তিশালী বাহিনী, যার পেছনে রয়েছে ৪৬৫টি যুদ্ধবিমান, কয়েক হাজার সাঁজোয়া যুদ্ধযান এবং আর্টিলারি।

সীমান্তের ওপারে আফগান তালেবানের সক্রিয় সামরিক সদস্য সংখ্যা মাত্র প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার; তাদের হাতে রয়েছে অল্প কিছু সাঁজোয়া যান এবং কার্যত কোনো বিমানবাহিনী নেই।

তবে ২০০১ সালে পশ্চিমা সামরিক শক্তির একটি বৃহৎ জোটের মোকাবিলা করে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা যুদ্ধ অভিজ্ঞ এই গোষ্ঠীটির হাতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-র মতো বিদ্রোহীদের ওপর নির্ভর করার সুযোগ রয়েছে, যা সীমান্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে এই সংঘর্ষ।

লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের রিডার অভিনাশ পালিওয়াল বলেন, ‘সুতরাং তালেবান হয় প্রান্তসীমা থেকে পিছু হটতে পারে, অথবা তারা এক ধাপ এগিয়ে সীমান্ত এলাকায় লড়াই চালিয়ে যেতে পারে এবং একই সঙ্গে টিটিপি, বিএলএ ও অন্যান্য গোষ্ঠীকে পাকিস্তানের ভেতরে তৎপরতা বাড়াতে আরো সমর্থন দিতে পারে।’

ইরান ও আফগানিস্তান উভয় দেশের সীমানা-সংলগ্ন পাকিস্তানের বৃহত্তম ও ছোট প্রদেশ বালোচিস্তানভিত্তিক বিএলএ কয়েক দশক ধরে চলা এক বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ও সমন্বিত হামলা চালিয়েছে।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে এসব বিদ্রোহীদের সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে—যা নয়াদিল্লি বারবার অস্বীকার করেছে—এবং গত মে মাস থেকে ভারত সীমান্তজুড়ে শক্তিশালী সামরিক মোতায়েন বজায় রেখেছে।

সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক মালিহা লোধি বলেন, ‘দুই-মুখী পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের জন্য এক দুঃস্বপ্নের দৃশ্যপট।’

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের জন্য (আফগানিস্তানের সঙ্গে) সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী ভাঙন তার নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জকে আরো জটিল করে তোলে, বিশেষত ভারতের সঙ্গে পূর্ব সীমান্তে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে।’

চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও কাতারসহ প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার আগ্রহ প্রকাশ করলেও এখন পর্যন্ত এসব প্রচেষ্টা সীমিত সাফল্য পেয়েছে।



    শেয়ার করুন: