মিয়ানমারের বিরল খনিজ রপ্তানি বেড়েই চলেছে, যাচ্ছে কোথায়

ছবি: রয়টার্স
গৃহযুেদ্ধ জর্জরিত মিয়ানমার থেকে ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ পদার্থ রপ্তানি দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই খনিজ পদার্থ নিয়ে বাণিজ্যযুদ্ধে নেমেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। এখন এই প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে জাপান ও ভারত। বিরল এই খনিজ পদার্থের জন্য বৈশ্বিক পরাশক্তিদের লড়াইয়ের মাশুল দিতে হচ্ছে স্থানীয় পরিবেশ ও বাসিন্দাদের। জান্তা বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত প্রতিরোধ গোষ্ঠীরা। এমন সময়ে দেশটি থেকে বিপুল এই বিরল খনিজ যাচ্ছে কোথায়?
গত সেপ্টেম্বর মাসে এক লাফে ৫ হাজার ২১ টন বিরল খনিজ উপাদান আমদানি করেছে চীন। সাংহাই মেটালস মার্কেটের তথ্যানুযায়ী, আগস্ট মাসের তুলনায় দেশটির এই ধরনের উপাদান আমদানির পরিমাণ ২৩ শতাংশ বেশি।
এই মোট আমদানির ৭০ শতাংশই এসেছে মিয়ানমার থেকে। বিপরীতে লাওস থেকে আমদানির পরিমাণ কমে ১ হাজার ৩৬৯ টনে নেমে এসেছে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত ৯ মাসে বিরল খনিজ আমদানির পরিমাণ শতকরা ১৪ ভাগ বেড়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটাই স্বাভাবিক করার পথে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সহকারী সচিব মাইকেল ভ্যান্স নেপিদোতে গিয়ে জান্তা প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে টোকিওতেও তাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জাপান নিজে দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করে স্বাগতিক দেশের ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া জাপানের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত চলতি মাসে জান্তা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। জাপানি আইনপ্রণেতারা মিয়ানমারে দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহায়তা ও সহযোগিতা পুনরায় শুরুর চেষ্টা করছেন। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৩০০টি জাপানি কোম্পানি সক্রিয়, ২০২০ সালে ছিল ৪০০টির বেশি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মিয়ানমারের ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপের চিঠি পাঠানোর পর দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগের নতুন পথ খোলে। ওয়াশিংটন এতদিন ধরে জান্তা সরকারকে একঘরে করে রাখার অবস্থান থেকে সরে এসে পুনরায় যোগাযোগের নীতি গ্রহণ করেছে। বাইডেন প্রশাসনের মেয়াদে মিয়ানমারের কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপ নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হয়েছে। বিতর্কিত নির্বাচনকে নিন্দা জানানোর ব্যাপারেও কিছু বলছে না ওয়াশিংটন।
বিবিসি জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসনে নিজেদের ভাবমূর্তি তৈরি ও প্রভাব বাড়াতে জান্তা সরকার ওয়াশিংটনের লবিং ফার্ম ‘ডিসিআই’ এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ লবিস্ট রজার স্টোনকে মাসিক ফি দিয়ে নিয়োগ করেছে। মূলত চীনের ওপর থেকে বিরল খনিজের নির্ভরতা কমাতে নেপিদোতে নজর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যার কারণে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশটির সঙ্গে ওয়াশিংটন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা ‘অনলাইন স্ক্যাম বা প্রতারণা কেন্দ্রগুলো’ বন্ধে সহযোগিতা নেওয়া। এই প্রতারণা চক্রগুলোর শিকার হয়ে মার্কিনরা শত কোটি ডলার হারিয়েছেন। তবে অনেক স্ক্যাম সেন্টার জান্তা সমর্থিত মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় এবং জান্তা এর থেকে লাভবান হওয়ায় তাদের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মূলত বিরল খনিজের জন্যই নেপিদোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন, এমনটাই গুঞ্জন।
জান্তা সমর্থকরা এখন অহংকারের সুরে বলছেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার লড়াইয়ে এই কোণঠাসা জান্তার তুরুপের তাস এই বিরল খনিজ। ভারতের সমান্তরাল আগ্রহের বিষয়টিকেও তারা এর প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
বাস্তবে মিয়ানমারে প্রায় ৬০০টি বিরল খনিজ কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে যে খনিগুলো থেকে চীনের চাহিদা মেটানো হতো সেগুলোর প্রায় সবই জান্তার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য বিরল খনিজ উপাদান অপরিহার্য। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুৎ যন্ত্র, স্মার্টফোন এবং সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চুম্বক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়।
বিশ্বজুড়ে এই খনিজ উত্তোলন ও পরিশোধনে একক আধিপত্য ধরে রেখেছে চীন। দেশটি বিশ্বব্যাপী বিরল খনিজ অক্সাইডের প্রায় ৭০ শতাংশ উৎপাদন করে এবং এর শোধন ক্ষমতার ৮৫ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। তবে চীনের অভ্যন্তরীণ খনিগুলোতে প্রধানত হালকা রেয়ার আর্থের আধিক্য থাকায় তারা কৌশলগত কারণে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের খনিগুলোর ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ভারী রেয়ার আর্থ (এইচআরইই) উৎপাদন করে মিয়ানমার। এর মধ্যে ডিসপ্রোসিয়াম এবং টারবিয়াম অত্যন্ত সংকটপূর্ণ ও কৌশলগত খনিজ, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির শক্তিশালী চুম্বক তৈরিতে অপরিহার্য। এতে চীনের দারুণ আগ্রহ রয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে চিহ্নিত ৬০০টির বেশি বিরল খনিজের খনির প্রায় ৮০ শতাংশ চীন ও ভারতের সীমান্তঘেঁষা কাচিন রাজ্যে অবস্থিত। সবচেয়ে বেশি খনি চিপউই এবং মোমাউক অঞ্চলে। স্টিমসন সেন্টার এবং ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি-মিয়ানমারের তথ্য অনুযায়ী, এই দুটি টাউনশিপেই রয়েছে ৩৭০টির বেশি সক্রিয় খনি।
২০২৪ সালের অক্টোবরের আগ পর্যন্ত কাচিন রাজ্যের খনিগুলো নিয়ন্ত্রণ করত নিউ ডেমোক্রেটিক আর্মি-কাচিন (এনডিএ-কে)। এটি জান্তা সমর্থিত একটি মিলিশিয়া বাহিনী, যা সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের অক্টোবরে কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি (কেআইএ) বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করলে মিলিশিয়ারা নিয়ন্ত্রণ হারায়। এনডিএ-কে বাহিনীকে পরাজিত করে চিপউই এবং পাংওয়ার খনিগুলো দখল করে নেয় কেআইএ বাহিনী। এর ফলে জান্তার হাত থেকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় খনিগুলো।
কাচিনের পরে এখন আলোচনায় শান রাজ্য। গত পাঁচ বছরে শান রাজ্যে বিরল খনিজের উত্তোলন গড়ে ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। তা'আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ), ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (ইউডব্লিউএসএ) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এনডিএএ)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় প্রায় ৯০টি বিরল খনিজের খনির সন্ধান পাওয়া গেছে।
স্টিমসন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, মানটং টাউনশিপের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে চীনা ও ‘ওয়া’ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি এবং ইউডব্লিউএসএ-এর প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক সহায়তা জড়িত।
২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীন তাদের মোট বিরল খনিজ আমদানির অন্তত ৬০ শতাংশ জোগান পেয়েছে মিয়ানমার থেকে, যা ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছিল।
বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় ভারতও মিয়ানমারের বিরল খনিজের লড়াইয়ে যোগ দিয়েছে। জুলাই মাসে মান্দালয়ে ভারতীয় দূতাবাস আয়োজিত এক খনি বিষয়ক ফোরামে রাষ্ট্রদূত অভয় ঠাকুর দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর রূপরেখা তুলে ধরেন।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শুভাকাঙ্ক্ষীদের দাবি, এই বিরল খনিজ সম্পদ বিচ্ছিন্ন ও কোণঠাসা হয়ে পড়া জান্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ট্রাম্পকার্ড হতে পারে। তবে বিরল খনিজের এই প্রতিযোগিতা যখন বৈদেশিক নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে, তখন আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো সামরিক জান্তাকে তোষামোদ করতে গিয়ে এক নির্মম বৈপরীত্যের মুখোমুখি হচ্ছে। কারণ মিয়ানমারের প্রায় কোনো খনির ওপরই জান্তা সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স ও দ্য ইরাবতী






