যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে ইরানের অর্থনীতি, চাকরি হারিয়ে দিশেহারা লাখো মানুষ

২ মার্চের বিমান হামলার পর তেহরানের একটি বাণিজ্যিক এলাকা থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়।
ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন কাটছে এখন চরম অভাবের মধ্যে। তেহরানের আসাল নামের এক ডিজাইনার আগে পেতেন বিদেশের অনেক কাজ। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দুই মাস ধরে কোনো নতুন প্রজেক্ট আসছে না তার হাতে। আক্ষেপ করে তিনি জানিয়েছেন, বর্তমান আয় দিয়ে সংসার চালানো এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আকাশপথে হাজার হাজার হামলা তছনছ করে দিচ্ছে ইরানের কলকারখানাগুলো। দেশটির প্রায় ২৩ হাজার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যুদ্ধের আঘাতে। এ কারণে সরাসরি কাজ হারিয়েছে অন্তত ১০ লাখ মানুষ। পরোক্ষভাবে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে বলে ধারণা করছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো।
জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় আমদানি ব্যবস্থাও পড়েছে মুখ থুবড়ে। অর্থনৈতিক এই ধসের কারণে ৫০ শতাংশ মানুষ এখন আছে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে। মুদ্রাস্ফীতির হার বর্তমানে ছাড়িয়ে গেছে ৭০ শতাংশের ঘর। নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে প্রতিদিন।
ইসরায়েলি বিমান হামলায় এখন প্রায় অচল বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। কাঁচামালের অভাবে অনেক বড় কোম্পানি ছাঁটাই করে দিচ্ছে শ্রমিকদের। এমনকি দুগ্ধজাত পণ্যের কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্যাকেজিং সরঞ্জামের অভাবে। আকাশপথের ফ্লাইট বন্ধ থাকায় বিমানকর্মীরাও এখন আছেন বেতনহীন অবস্থায়।
আরও কমলো সোনার দাম
২৯ এপ্রিল ২০২৬
বেকারত্ব ভাতার জন্য আবেদনের পাহাড় জমছে সরকারি দপ্তরে। গত দুই মাসে আবেদনকারীর সংখ্যা বেড়েছে আগের চেয়ে প্রায় তিন গুণ। এই অভাবের সব থেকে বড় ধাক্কা লাগছে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর। প্রভাব ও আইনি সুরক্ষা না থাকায় তারা পড়েছেন সব থেকে বেশি বিপদে।
দেশটির নামীদামি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোও লোকবল কমিয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাগুলো এখন চরম দুর্বল অবস্থায় আছে। অনেক ডেটা অ্যানালিস্ট এখন বাঁচার তাগিদে চিন্তা করছেন রাইড শেয়ারিং অ্যাপে গাড়ি চালানোর কথা। মাথার ওপর ঋণের বোঝা নিয়ে ভবিষ্যতের চিন্তায় তারা আছেন অস্থির হয়ে।
অনলাইন কাজ বন্ধ হওয়ায় বিপদে পড়েছেন ঘরে কাজ করা নারীরাও। অনলাইনে ভাষা শিখিয়ে যারা আয় করতেন, তারা এখন দেশি অ্যাপে ক্লাস নিতে পারছেন না ঠিকমতো। প্ল্যাটফর্মগুলো বারবার নষ্ট হওয়ায় ছাত্রছাত্রীরাও অংশ নিতে পারছে না ক্লাসে। বেকারদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই হলেন কর্মজীবী নারী।
রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারও আছে অনেক চাপে। বড় ধরনের সরকারি সাহায্য ছাড়া এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে অনেক কঠিন। কর মওকুফ আর সহজশর্তে ঋণের ব্যবস্থা না করলে বেকারের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে চারদিকে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও সাধারণ কর্মীরা কাজ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে আছেন। চেম্বার অব কমার্স দাবি করছে, এ দুঃসময়ে মালিকদের উচিত মমতার সঙ্গে কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো।
এ সংকটের জন্য সরকার দোষ দিচ্ছে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে। গরিবদের জন্য ভাউচার সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে প্রশাসন। তবে কেবল কথা দিয়ে যে কাজ হবে না, তা মনে করিয়ে দিচ্ছে স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো। যুদ্ধকালীন অর্থনীতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এখন চলে এসেছে।
কয়েক বছর আগে হওয়া বিক্ষোভের ক্ষত এখনো শুকিয়ে যায়নি ইরানিদের মনে। অভাব আর অনিশ্চয়তা এখন গ্রাস করছে দেশটির প্রতিটি পরিবারকে। সামনের দিনগুলোতে কী ঘটবে, সেই আশঙ্কায় মানুষের দিন কাটছে চরম উদ্বেগের মধ্যে।




