রিজার্ভ ও মুদ্রা রক্ষায় নজিরবিহীন পদক্ষেপ
৫.১ টন সোনা বিক্রি করল তানজানিয়া সেন্ট্রাল ব্যাংক

বিশ্ববাজারে রেকর্ড চড়া দামের অভূতপূর্ব সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং দেশের মুদ্রা 'তানজানিয়ান শিলিং'-এর মান স্থিতিশীল রাখতে নজিরবিহীন মেগা সিদ্ধান্ত নিয়েছে পূর্ব আফ্রিকান অর্থনৈতিক পরাশক্তি তানজানিয়া। দেশটি তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুসংরক্ষিত ভল্ট থেকে একলপ্তে ৫.১ মেট্রিক টন খাঁটি সোনা আন্তর্জাতিক খোলা বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে।
আজ ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে তানজানিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ব্যাঙ্ক অব তানজানিয়া' এর গভর্নর ড. ইমানুয়েল টু টুবা দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী দার এস সালামে আয়োজিত এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে এই মেগা আর্থিক সিদ্ধান্তের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স, ব্লুমবার্গ এবং অফিশিয়াল আফ্রিকান মাইনিং মার্কেটের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও ডলার সংকটের মুখে বৈশ্বিক স্বর্ণের আকাশচুম্বী দামকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কাঙ্ক্ষিত স্তরে নিয়ে যাওয়াই ছিল এই ঐতিহাসিক বিক্রির প্রধান অর্থনৈতিক লক্ষ্য।
৩৫.৪ টন সোনা থেকে মেগা সেল: কীভাবে কাজ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব?
ব্যাঙ্ক অব তানজানিয়ার পরিসংখ্যান ও সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, এই মেগা বিক্রির সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পূর্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুরক্ষিত রাজকোষে মোট ৩৫.৪ মেট্রিক টন সোনা গচ্ছিত ছিল। দেশের অভ্যন্তরে পরিচালিত ক্ষুদ্র ও বৃহৎ স্বর্ণখনিগুলো থেকে জাতীয় রিজার্ভ কর্মসূচির আওতায় গত কয়েক বছরে এই বিপুল পরিমাণ খাঁটি সোনা সংগ্রহ করেছিল সরকার।
নিজের বক্তব্যে ড. ইমানুয়েল টু টুবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশলগত অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, "সেন্ট্রাল ব্যাংকের মূল কাজই হলো আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে বুলিয়ন মজুত ব্যবস্থাপনা করা। যখন বিশ্ববাজারে সোনার দাম রেকর্ড সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করে, তখন তা বিক্রি করে আন্তর্জাতিক ভল্টে ইউএস ডলারের শক্তিশালী ব্যাকআপ তৈরি করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে করে দেশে জরুরি পণ্যের আমদানি ব্যয় মেটানো সহজ হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমরা আবার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সোনা কিনে রাজকোষের রিজার্ভ পূর্ণ করব।"
আফ্রিকান অর্থনীতি, ডলার সংকট ও বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ
আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্বব্যাপী ডলার সংকট ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামাল দিতে আফ্রিকার অন্য যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় তানজানিয়ার এই কৌশলগত পদক্ষেপ একটি অনন্য মাস্টারস্ট্রোক।
বর্তমানে পুরো আফ্রিকা মহাদেশেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট দেখা দিয়েছে। কেনিয়া, উগান্ডা ও তানজানিয়ার মতো দেশগুলোতে খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ ও জ্বালানি তেল আমদানির জন্য নিয়মিত প্রচুর পরিমাণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বা ইউএস ডলার মেটাতে হয়।
সেন্ট্রাল ব্যাংক কর্তৃক বিক্রি হওয়া ৫.১ টন সোনা থেকে অর্জিত শত শত মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক অর্থ সরাসরি দেশটির আমদানিনির্ভর বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে ভূমিকা রাখবে। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে তানজানিয়ান শিলিং-এর দ্রুত দরপতন রোধ করে দেশীয় মুদ্রাকে একটি সুদৃঢ় ও স্থিতিশীল ভিত্তি দেবে।
পূর্ব আফ্রিকান জোট ও ভবিষ্যৎ বাজারের প্রতিক্রিয়া
পূর্ব আফ্রিকান অর্থনৈতিক জোটের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপরও তানজানিয়ার এই সাহসী সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তানজানিয়ার এই উদ্যোগ দেখে কেনিয়া ও ঘানার মতো অন্যান্য আফ্রিকান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও তাদের স্বর্ণ রিজার্ভকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহার করার চিন্তাভাবনা করছে।
তানজানিয়া সেন্ট্রাল ব্যাংকের এই মেগা পদক্ষেপ আফ্রিকান ও আন্তর্জাতিক ফাইনান্সিয়াল মার্কেটে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিময় বাজারে তানজানিয়ান শিলিং-এর মান ইতিবাচক মোড় নিতে শুরু করেছে।



