সুদানে চলছে নৃশংস যুদ্ধ, নিশ্চুপ পুরো বিশ্ব

সংগৃহীত ছবি
সুদানের দারফুরের আকাশে আজও আগুনের ধোঁয়া ভাসে। ভাঙা ঘর, পোড়া হাসপাতাল আর রক্তমাখা রাস্তাগুলো যেন প্রতিদিন নতুন করে বলে যায় যুদ্ধের গল্প। কোথাও মায়ের কোলে নিথর শিশু, কোথাও পরিবার হারিয়ে অনিশ্চিত পথে হাঁটছে হাজারো মানুষ। অথচ পৃথিবীর বড় একটি অংশ যেন এই কান্না শুনেও শুনছে না।
বিশ্ব যখন অন্য যুদ্ধ আর রাজনৈতিক উত্তেজনায় ব্যস্ত, তখন দারফুরে নীরবে চলছে মৃত্যু। ধ্বংস আর উদ্বাস্তু জীবনের দীর্ঘ মিছিল। একের পর এক শহর পরিণত হচ্ছে ধ্বংসস্তূপে। লাখো মানুষ হারাচ্ছে ঘর, স্বজন আর বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকুও। কিন্তু এত রক্ত, এত আর্তনাদের পরও আন্তর্জাতিক বিশ্ব যেন এখনো পুরোপুরি চোখ ফেরায়নি সুদানের দিকে।
বিশ্ব যখন গাজা, ইউক্রেন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় ব্যস্ত। তখন সুদানের পশ্চিমাঞ্চলীয় দারফুরে নীরবে জ্বলতে থাকে আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধ।
স্থানীয়দের ভাষায়, এই যুদ্ধ কখনোই সত্যিকারে থামেনি। শুধু বদলেছে মুখ এবং বদলেছে অস্ত্রের ধরন; কিন্তু থামেনি মৃত্যু আর মানুষের দীর্ঘ আর্তনাদ।
দারফুরের গভর্নর সুলিমান আকরুয়া ‘মিন্নি’ মিনাওয়ি বলেছেন, সুদানের প্রতিটি সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় দারফুরের মানুষকে। তার অভিযোগ, র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (আরএসএফ) একের পর এক শহর দখল করে সেগুলোকে পরিণত করছে ‘ভূতের শহরে’। যেখানে নেই মানুষের স্বাভাবিক জীবন, নেই নিরাপত্তা— আছে শুধু ভয়, লুটপাট আর মৃত্যু।
এল জেনেইনা, এল ফাশের, নিয়ালা কিংবা জালিঙ্গেই একসময় মানুষের কোলাহলে ভরা এসব শহর এখন ধ্বংসস্তূপ। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে মরদেহ। ধ্বংসের সেই চিহ্ন এতটাই স্পষ্ট যে অনেকেই বলছেন, এটি এমন এক গণহত্যা, যা মহাকাশ থেকেও দেখা যায়।
মিন্নি মিনাওয়ির দাবি, ২০২৩ সালে এল জেনেইনায় মাসালিত জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো হত্যাযজ্ঞ ছিল পরিকল্পিত গণহত্যা। তার ভাষায়, মাত্র ৩ দিনে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। একইভাবে এল ফাশেরেও অবরোধ, বোমা হামলা আর নির্বিচার হত্যায় প্রাণ হারিয়েছে অসংখ্য মানুষ। হাসপাতাল, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র কোনো কিছুই রক্ষা পায়নি।
যুদ্ধ শুধু জীবন কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে মানুষের ভবিষ্যতও। লাখো মানুষ ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। কেউ সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিয়েছে চাদ বা মধ্য আফ্রিকায়। কেউ আবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে। শিশুদের অনেকেই অপুষ্টি, রোগ আর চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে। যারা বেঁচে আছে, তাদের দিন কাটছে অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, দারফুর এখন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটি। কিন্তু সেই সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নেই তেমন জোরালো আলোচনা। নেই যথেষ্ট কূটনৈতিক চাপ কিংবা কার্যকর উদ্যোগ।
এই যুদ্ধের পেছনে বিদেশি শক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশ থেকে যোদ্ধারা আরএসএফে যোগ দিচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক অস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের বিষয়টিও সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে।
অথচ সুদান এমন একটি দেশ, যার মাটির নিচে রয়েছে বিপুল তেল ও স্বর্ণসম্পদ। আছে উর্বর কৃষিজমি। কিন্তু যুদ্ধ সেই সম্ভাবনাকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে প্রতিদিন। সম্পদে ভরপুর একটি দেশ ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে ক্ষুধা, উদ্বাস্তু আর ধ্বংসের ভূখণ্ডে।
তারপরও শান্তির আশাটা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। মিনাওয়ির ভাষায়, যুদ্ধের শেষ হতে হবে আলোচনার টেবিলেই। কারণ এই যুদ্ধ শুধু ক্ষমতার নয়, এটি লাখো সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার যুদ্ধ। আর সেই মানুষগুলোর একটাই প্রশ্ন— পৃথিবী আর কতদিন নীরব থাকবে?




