আখের ক্ষেত থেকে জাতীয় নেতৃত্বে : দক্ষিণ আফ্রিকান ভারতীয়দের গল্প

দক্ষিণ আফ্রিকান ভারতীয় কয়েকজন যুবক-যুবতী। ছবি : সংগৃহীত
দক্ষিণ আফ্রিকার বহুজাতিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ আজ ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী। প্রায় ১৪ লাখের বেশি মানুষের এই সম্প্রদায়ের ইতিহাস শুধু অভিবাসনের নয়; এটি সংগ্রাম, বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, সংস্কৃতির বিকাশ এবং রাষ্ট্র নির্মাণে অবদানের ইতিহাসও।
প্রায় দেড় শতাব্দী আগে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই জনগোষ্ঠী বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতি, ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
১৮৬০ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম ভারতীয় চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের একটি দল ব্রিটিশ উপনিবেশ নাটালে পৌঁছায়। মূলত চিনিকলের আখের বাগানে শ্রমের চাহিদা পূরণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ভারত থেকে হাজার হাজার শ্রমিক নিয়ে আসে।
১৮৬০ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ভারতীয় শ্রমিক নাটালে পৌঁছান। তাদের অধিকাংশই ছিলেন বর্তমান ভারতের তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ ও বিহার অঞ্চলের বাসিন্দা।
একই সময়ে আরেকটি শ্রেণির ভারতীয় দক্ষিণ আফ্রিকায় যান নিজেদের উদ্যোগে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সন্ধানে যাওয়া এই মানুষদের বলা হতো ‘প্যাসেঞ্জার ইন্ডিয়ান’ বা ‘মুক্ত ভারতীয়’। তারা দোকানপাট, পাইকারি ব্যবসা এবং বিভিন্ন সেবামূলক খাতে দ্রুত নিজেদের অবস্থান তৈরি করেন।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অনেক শ্রমিক ভারতে ফিরে গেলেও অধিকাংশই দক্ষিণ আফ্রিকায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের উত্তরসূরিরাই আজকের ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকানদের বৃহৎ অংশ।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ নিজেদের ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে পরিচয় দেন।
সবচেয়ে বেশি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস কোয়াজুলু-নাটাল প্রদেশে, বিশেষ করে ডারবান শহরে। সাব-সাহারান আফ্রিকার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় ভারতীয় জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের ইতিহাস শুধু শ্রমিক হিসেবে আগমনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসবিদদের মতে, ডাচ ঔপনিবেশিক আমলে সপ্তদশ শতক থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বহু মানুষ দাস হিসেবে কেপ অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তারা স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ ও মিশ্রবর্ণের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ধীরে ধীরে একীভূত হয়ে যায়।
ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য
দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সাংস্কৃতিক পরিচয় অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ ইংরেজিকে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করলেও প্রবীণদের একটি অংশ এখনো হিন্দি, তামিল, তেলেগু, গুজরাটি, উর্দু ও পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলেন।
ধর্মীয় দিক থেকেও রয়েছে বৈচিত্র্য। হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মুসলিম, খ্রিস্টান ও শিখ সম্প্রদায়েরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। দীপাবলি, ঈদ, রমজান, থাই পুসাম কাভাদি এবং শিখদের প্রকাশ উৎসব দেশটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের পরিচিত আয়োজন।
ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব দক্ষিণ আফ্রিকার খাদ্যসংস্কৃতিতেও স্পষ্ট। ডারবানের বিখ্যাত ‘বানি চাও’—যেখানে অর্ধেক পাউরুটির ভেতর কারি ভরে পরিবেশন করা হয়— আজ দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। বিভিন্ন ধরনের কারিও স্থানীয় রন্ধনশৈলীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম
দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয়দের রাজনৈতিক ইতিহাস বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৮৯৩ সালে তরুণ আইনজীবী মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে বর্ণবৈষম্যের মুখোমুখি হন। এখানকার অভিজ্ঞতাই তার অহিংস প্রতিরোধ বা সত্যাগ্রহ দর্শনের ভিত্তি তৈরি করে। ভারতীয়দের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে তিনি ১৮৯৪ সালে নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সম্প্রদায়ের অনেক নেতা আফ্রিকান জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। আহমেদ কাথরাদা, ইউসুফ দাদু, ফাতিমা মীর ও ম্যাক মহারাজের মতো ব্যক্তিত্ব দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাদের অনেকেই কারাবরণ করেছেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে রবেন দ্বীপের কারাগারে বন্দী ছিলেন।
তবে এই ইতিহাস সবসময় সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময় ভারতীয়দের নাটালের বাইরে বসবাসে বিধিনিষেধ ছিল। অরেঞ্জ ফ্রি স্টেটে বসবাসের অনুমতিও দেওয়া হতো না। ১৯৪৯ সালে ডারবানে ভয়াবহ দাঙ্গায় ১৪২ জন ভারতীয় নিহত হন।
পরে বর্ণবাদী সরকারের ‘গ্রুপ এরিয়াস অ্যাক্ট’-এর কারণে হাজারো ভারতীয় পরিবার তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা হারায়। ১৯৮৩ সালের ত্রিকক্ষীয় নির্বাচনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের ব্যাপক বয়কট এবং আফ্রিকান জনগণের সঙ্গে সংহতি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।
নতুন অভিবাসন, নতুন বাস্তবতা
১৯৯৪ সালে গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকার যাত্রা শুরু হওয়ার পর বর্ণবাদী আমলের অভিবাসন নীতির অবসান ঘটে। এরপর ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ থেকে নতুন অভিবাসীরা দেশটিতে আসতে শুরু করেন।
তবে বহু প্রজন্ম ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সঙ্গে নতুন অভিবাসীদের সাংস্কৃতিক পার্থক্য এখনো স্পষ্ট। পুরনো সম্প্রদায় নিজেদেরকে দক্ষিণ আফ্রিকার সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখলেও তারা একই সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কও বজায় রেখেছে।
ব্যবসা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে সাফল্য
রাজনীতির বাইরে ব্যবসা ও সংস্কৃতিতেও ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকানদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। শিল্পপতি ভিভিয়ান রেড্ডি দেশের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। চিকিৎসক থেকে উদ্যোক্তা হওয়া ইকবাল সুরভে দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ সংবাদমাধ্যম গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
অভিনয় জগতে জ্যাক ডেভনারাইন দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় মুখ। আর ক্রিকেটে ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান হাশিম আমলা আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে বিবেচিত হন। অন্যদিকে বাঁহাতি স্পিনার কেশব মহারাজ বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকা দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। অলরাউন্ডার সেনুরান মুথুসামিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্রের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ
বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয় সম্প্রদায় শুধু একটি অভিবাসী জনগোষ্ঠী নয়; তারা দেশটির বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ। ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ধরে রেখেও তারা দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের একীভূত করেছে।
দেড় শতকেরও বেশি সময় আগে আখের বাগানের শ্রমিক হিসেবে শুরু হওয়া যাত্রা আজ রাষ্ট্র পরিচালনা, ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দৃশ্যমান সাফল্যের গল্পে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর এই যাত্রা অভিবাসন, সংগ্রাম এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার এক অনন্য অধ্যায়।








