আগামীর সময়

লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী আল-কুদস মিছিল নিষিদ্ধ

লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী আল-কুদস মিছিল নিষিদ্ধ

সংগৃহীত ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ও সম্ভাব্য জন অশান্তির আশঙ্কা দেখিয়ে এ বছর লন্ডনে অনুষ্ঠিতব্য ফিলিস্তিনপন্থী আল-কুদস ডে মিছিল নিষিদ্ধ করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। প্রায় চার দশক ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা এই কর্মসূচির ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা এবারই প্রথম আরোপ করা হলো।

২০১২ সালের পর যুক্তরাজ্যে এই প্রথম কোনো প্রতিবাদ মিছিল নিষিদ্ধ করা হলো। ওই বছর উগ্র ডানপন্থী সংগঠন ইংলিশ ডিফেন্স লিগের মিছিলও কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছিল।

লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ এ বছর আল-কুদস ডে মিছিল বন্ধের সুপারিশ করে। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ সেই সুপারিশ অনুমোদন দেন। রবিবার লন্ডনে এই বার্ষিক মিছিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য পাল্টা বিক্ষোভের কারণে গুরুতর জনঅশান্তি এড়াতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভয়াবহ গণ-অশান্তি প্রতিরোধের স্বার্থেই এই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন ছিল।’

কোনো বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানদণ্ড খুবই কঠোর এবং আমরা হালকাভাবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিই না। ২০১২ সালের পর এই প্রথম আমরা এ ক্ষমতা ব্যবহার করছি, জানালেন মেট্রোপলিটন পুলিশের জনশৃঙ্খলা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার অ্যাডে আদেলেকান।

‘পুলিশের মূল্যায়নে এই মিছিলটি বিশেষ ধরনের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সম্ভাব্য বিপুলসংখ্যক অংশগ্রহণকারী ও পাল্টা বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে,’ তিনি যোগ করলেন।
আদেলেকানের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এবং যুক্তরাজ্যে ইরানি রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগও পুলিশের বিবেচনায় এসেছে। মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। ঝুঁকিও অত্যন্ত গুরুতর। তাই মিছিলে শর্ত আরোপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

পুলিশ জানিয়েছে, এই মিছিলের আয়োজক সংগঠন ইসলামিক হিউম্যান রাইটস কমিশন (আইএইচআরসি)। সমালোচকদের মতে, সংগঠনটি ইরানপন্থী হিসেবে পরিচিত। অতীতে এই মিছিলে লেবাননের সংগঠন হিজবুল্লাহর পতাকা ওড়ানোর অভিযোগও রয়েছে, যা যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ। গোয়েন্দা তথ্যে বলা হয়েছে, এই মিছিল ঘিরে লন্ডনে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা সহিংসতা তৈরি হতে পারে।

বুধবার বিকাল ৪টা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে এবং এক মাস পর্যন্ত বহাল থাকবে। রবিবারের নির্ধারিত আল-কুদস মিছিল এবং এ উপলক্ষে পরিকল্পিত পাল্টা বিক্ষোভও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে।

তবে পুলিশ জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী তারা কোনো স্থির সমাবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে না। ফলে আয়োজকেরা নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে সমাবেশ (স্ট্যাটিক প্রোটেস্ট) করতে পারবেন, যদিও সেখানে কঠোর শর্ত আরোপ করা হবে।

আয়োজক সংগঠন ইসলামিক হিউম্যান রাইটস কমিশন সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং জানিয়েছে, তারা আইনি চ্যালেঞ্জ জানাবে। সংগঠনটি বলেছে, রবিবার তারা একটি স্থির সমাবেশ করার পরিকল্পনা করছে।

আইএইচআরসির অভিযোগ, পুলিশ জায়নিস্ট লবির চাপের কাছে নতিস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে তারা এ অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে যে সংগঠনটি ইরান সরকারের পক্ষে কাজ করে। তাদের দাবি, আইএইচআরসি একটি স্বাধীন বেসরকারি সংগঠন।

সংগঠনটি বলেছে, অতীতের বিক্ষোভগুলো শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল। তাই সরকারের এই সিদ্ধান্তের তারা তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং আইনি লড়াইয়ের জন্য পরামর্শ নিচ্ছে।

আইএইচআরসি ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও পুলিশের সমালোচনা করে দাবি করেছে, সংশ্লিষ্টরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকার মানুষের স্বার্থের চেয়ে ইসরায়েলের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং বর্তমানে তারা ইসরায়েল ফার্স্ট নীতিতে কাজ করছেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একটি অংশও এই নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতি সংহতি জানিয়ে এই র‍্যালিটি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। এবারের নিষেধাজ্ঞার ফলে দীর্ঘদিনের এই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে গেল।

তবে ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রীরা এই সিদ্ধান্তকে বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না৷ দেশটির মন্ত্রী ড্যারেন জোনস জানলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশের অধিকার সবার আছে, কিন্তু ঘৃণা ছড়ানো বা সহিংসতা উসকে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।’

এদিকে গাজা যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাব লন্ডনেও পড়েছে। গত শনিবার ইরানি শাসনব্যবস্থার পক্ষ-বিপক্ষ মতাদর্শকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তি ছুরিকাহত হওয়ার ঘটনার পর থেকেই পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আল-কুদস ডে প্রতি বছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার বিশ্বব্যাপী পালন করা হয়। এ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন এবং ইসরায়েলের দখলদারির বিরোধিতা প্রকাশ করা হয়।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি আল-কুদস ডে পালনের সূচনা করেন। সমালোচকদের দাবি, ইরান এই কর্মসূচিকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নিতে ব্যবহার করে।

কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানিয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত মিছিল আয়োজন বা তাতে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। একই সঙ্গে সপ্তাহান্তে লন্ডনের কেন্দ্রীয় এলাকায় পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো হবে বলেও জানানো হয়েছে।

    শেয়ার করুন: