তুরস্কে কেন এত সিঙ্কহোল তৈরি হচ্ছে

তুরস্কের বিস্তীর্ণ কৃষিভূমিতে একের পর এক তৈরি হচ্ছে সিঙ্কহোল। ছবি: সংগৃহীত
তুরস্কের বিস্তীর্ণ কৃষিভূমিতে একের পর এক তৈরি হচ্ছে সিঙ্কহোল বা বিশাল গর্ত। দীর্ঘদিনের খরা, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে যাচ্ছে দেশটির ভূপ্রকৃতি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আরও গভীর হতে পারে এই সংকট।
তুরস্কের শস্যভাণ্ডার বলা হয় কোনিয়া প্রদেশকে। বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলের খামারগুলোই বড় অংশ পূরণ করে খাদ্য চাহিদার। কিন্তু শুকিয়ে যাচ্ছে এখানকার ভূগর্ভস্থ পানি। আর তার ফলেই জমিতে তৈরি হচ্ছে বিশাল সিঙ্কহোল। এতে কৃষি, পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে অঞ্চলটি।
এ অঞ্চলের কারাপিনার এলাকার কৃষক মেহমেত আকিফ ইশিকলি। প্রায় ৩০ বছর ধরে চাষ করছেন আলফালফা, ভুট্টা, গমসহ বিভিন্ন ফসল। প্রায় ২০ বছর আগে একটি বিশাল গর্ত তৈরি হয় নিজের জমিতেই। সম্প্রতি একই ধরনের আরেকটি সিঙ্কহোল সৃষ্টি হয়েছে পাশের জমিতেও।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ‘গ্রামের লোকজন খবর দেওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন ধসে পড়ছে জমির মাটি। ভেতর থেকে বুদবুদ করে উঠছে পানি।
তুরস্কের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এএফএডি) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৬৮৪টি বড় সিঙ্কহোল সৃষ্টি হয়েছে কোনিয়া অববাহিকায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টির ব্যাস ২২৮ মিটার এবং গভীরতা ১৭১ মিটার। একসময় দেশের অন্যতম উর্বর কৃষিভূমি হিসেবে পরিচিত অঞ্চলটিতে এখন শুধু অসংখ্য বিশাল গর্তের ছাপ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে রয়েছে ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত খরা এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের সম্মিলিত প্রভাব।
তুরস্ক জুড়ে চলছে খরা। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে পানিসংকটাপন্ন দেশে পরিণত হতে পারে তুরস্ক। খরার কারণে নদী, হ্রদ ও জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা সেচের জন্য ক্রমেই বেশি নির্ভর করছেন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর।
পরিবেশবাদী সংগঠন দোগা ডেরনেগির প্রতিষ্ঠাতা গুভেন একেন জানিয়েছেন, এই অঞ্চলের চুনাপাথরের স্তরকে স্থিতিশীল রাখে ভূগর্ভস্থ পানিই। কিন্তু অতিরিক্ত সেচের কারণে দ্রুত নিচে নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ফলে মাটির নিচের কাঠামো দুর্বল হয়ে ধসে পড়ছে।
বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিল (ডব্লিউডব্লিউএফ) তুর্কিয়ের মিঠাপানি বিষয়ক কর্মসূচির ব্যবস্থাপক এরেন আতাক জানান, ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, কোনিয়া অববাহিকায় প্রায় এক লাখ কূপের মধ্যে ৬৬ হাজারই ছিল অবৈধ। সে সময়ই পানির প্রাপ্যতার তুলনায় পানি ব্যবহার করা হচ্ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
তার ভাষ্য, কৃষকেরা বর্তমানে সেচের জন্য যে পরিমাণ পানি তুলছেন, তা ভবিষ্যতের পানি ব্যবহারকে আগাম খরচ করার মতো। তারা নিজেরাই মাটি ধসিয়ে ফেলছে পায়ের নিচের। সিঙ্কহোলগুলো আসলে বহুদিন ধরে চলা এই সংকটের শেষ দৃশ্য মাত্র। এখন তা দৃশ্যমান, কিন্তু আগেও ছিল, শুধু সিঙ্কহোল আকারে নয়।
ইতিহাস জুড়ে কোনিয়া সমভূমিতে ধস ছিল। কোনিয়া টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক প্রকৌশল বিভাগের প্রধান ফেতুল্লাহ আরিক জানান, এই অঞ্চলে হাজার হাজার বছর আগেও তৈরি হতো সিঙ্কহোল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর সংখ্যা বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আতঙ্কে সিঙ্কহোল মাটি দিয়ে ভরাট করার চেষ্টা করেন অনেক কৃষক। কিন্তু এটি হতে পারে আরও বিপজ্জনক। কারণ নিচে বড় ফাঁপা জায়গা থাকায় আবারও নামতে পারে ধস।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৬০-এর দশকে প্রণীত কৃষিনীতি বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখনো সরকার পানিনির্ভর ফসল যেমন চিনি বিট ও ভুট্টা উৎপাদনে ভর্তুকি দিচ্ছে। অথচ এসব ফসলের জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ পানি। যা এই অঞ্চলের বর্তমান জলসম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাদের মতে, আঙুর বা স্থানীয় জাতের গমের মতো কম পানিনির্ভর ফসলের চাষে উৎসাহ দিলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে এবং রক্ষা পাবে পরিবেশের ভারসাম্যও।
ডব্লিউডব্লিউএফের এরেন আতাক বলেছেন, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষায় কৃষি, বন ও মৎস্যসম্পদ টিকিয়ে রাখা জরুরি। কৃষকদের দোষ না দিয়ে সরকারের পরিকল্পনা, দিকনির্দেশনা ও প্রণোদনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
এদিকে কোনিয়া টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সিঙ্কহোলের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে তৈরি করছেন বিশেষ মানচিত্র। যাতে এটি কাজে লাগানো যায় ভবিষ্যৎ নগর ও ভূমি ব্যবস্থাপনায়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সিঙ্কহোলের অবস্থান চিহ্নিত করলেই হবে না। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার এবং কৃষিনীতি পরিবর্তন না হলে আরও ভয়াবহ হবে সংকট।
কারাপিনারের কৃষক জানের চোরাকচি জানিয়েছেন, এখন ধসের প্রভাব পড়ছে অনেক জমিতেই। তবু জীবিকার তাগিদে চালিয়ে যেতে হচ্ছে চাষাবাদ।
তার ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। তারপরও তাদের বিশ্বাস, একদিন উন্নতি হবে পরিস্থিতি।







