কাঁদছেন মেসি কাঁদছে রোজারিও

প্রিয় বাবাকে শেষ বিদায় জানাতে লিওনেল মেসি এখন রোজারিওতে। জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিনে প্রিয় নায়ককে বুকে টেনে নিয়েছে এই শহর। স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো আর তিন সন্তানকে নিয়ে স্থানীয় সময় পরশু রাত ৮টা ৪৪ মিনিটে রোজারিওতে আসেন মেসি। বিমান থেকে নেমেই যান ‘এল প্রাদো’ সমাধিস্থলে, সেখানেই সমাহিত করা হবে হোর্হেকে।
বাবার মৃত্যুতে মেসি কষ্ট পাচ্ছেন, সেই কষ্টের ভাগীদার হয়ে কাঁদছে রোজারিও, আর্জেন্টিনা আর বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ভক্তও।
দক্ষিণ রোজারিওর ‘লা বাহাদা’ পাড়ার লাভাল্লেহা স্ট্রিটে লিওনেল মেসির বেড়ে ওঠার সেই বাড়িটি ঘিরে ছিল জনস্রোত। সবাই এসেছিলেন হোর্হেকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। এই পথ দিয়ে হাঁটা মানুষগুলো গেছেন নীরবতায়, শ্রদ্ধায় মাথা নোয়ানো ছিল সবার।
এটি একটি সাধারণ নিম্নবিত্ত পাড়া, নিচু বাড়ি আর সরু গলি— যেখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল মেসি-কিংবদন্তির। কিন্তু গত দুদিন হোর্হের প্রতি ভালোবাসা জানাতে ছিল প্রচুর মানুষের সমাগম আর রাস্তার গাড়িগুলোও ছিল অন্য এলাকার। ‘ওলে’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক নারী বলছিলেন, ‘না এসে পারলাম না। হোর্হে কী দারুণ একজন মানুষ ছিলেন!’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরী মেয়েটি চোখের কোণে পানি নিয়ে মাথা নাড়ছিল তখন।
মেসি পরিবারের বাড়ির গেটের সামনে ভক্তরা বিভিন্ন বার্তা লেখা ব্যানার ঝুলিয়ে দিচ্ছেন। সেখানে আর্জেন্টিনার পতাকার ওপর লেখা সবচেয়ে আবেগঘন বার্তাটি এরকম, ‘লিও, এমন কোনো শব্দ নেই, যা তোমার এই কষ্ট কমাতে পারে। কেঁদে নাও, পরিবারকে জড়িয়ে ধরো, তাকে মনে করো। আর একদিন, যখন তুমি আবার স্টেডিয়ামের দিকে তাকাবে, তখন অনুভব করবে বাবার একটি অংশ সবসময় তোমার সঙ্গে রয়েছে। শান্তিতে ঘুমান, প্রিয় হোর্হে।’
সেখানে রাখা হয়েছে নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের একটি ছোট জার্সি, রোজারিওর এই ক্লাবে ডিয়েগো ম্যারাডোনার খেলার সময়ের একটি ছবি, আছে কলম্বিয়া ও পেরুর পতাকা। এমনকি হন্ডুরাসের এক ভক্তের বার্তাও স্থান পেয়েছে সেখানে, ‘লিও, রোজারিও এবং পুরো বিশ্ব তোমাকে ভালোবাসে। শক্ত থাকো, অধিনায়ক! আমরা তোমাকে ভালোবাসি।’
ইন্টার মায়ামির হয়ে লিগস কাপে গতকাল মেক্সিকান ক্লাব মন্টেরির বিপক্ষে খেলা হয়নি মেসির। অধিনায়কের অনুপস্থিতিতে মায়ামির খেলোয়াড়রা হাতে কালো ব্যান্ড পরে হোর্হে মেসিকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। খেলা শুরুর আগে দর্শকরাও পালন করেছিলেন এক মিনিটের নীরবতা।
মেসির ১০ নম্বর জার্সির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ম্যাচের ১০ মিনিটে গ্যালারিতেও দেখা যায় মেসির নামে পতাকা, শোনা যায় স্লোগান। ম্যাচটি ২-১ গোলে হেরেছে মায়ামি। দলের হয়ে একমাত্র গোল করার পর শোকার্ত মেসিকে সেটি উৎসর্গ করেন রোদ্রিগো দে পল। গোলের পরই তিনি জার্সি খুলে ফেলেন। জার্সির নিচে ছিল মেসির ১০ নম্বর জার্সি। সেটি দর্শকদের দেখিয়ে সতীর্থের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন দে পল।
বাবার মৃত্যুতে রোজরিওতে আসার অনেক আগেই মেসি জানতেন যে, হোর্হের শারীরিক অবস্থা আর ভালো হওয়ার নয়। তাই জীবনের কঠিন দিনগুলোতে নিজেকে ফুটবলেই সঁপে দিয়েছিলেন, যে খেলাটি ছিল বাবা ও ছেলের দশকের পর দশক ধরে ভাগ করে নেওয়া এক অনন্য আবেগ।
ইন্টার মায়ামির হয়ে লিগস কাপে গত বুধবার মাঠে নেমেছিলেন মেসি। ৪-২ ব্যবধানে জয় পাওয়ার দিনে জোড়া গোলও করেছিলেন। এত বড় কষ্ট বুকে চেপেও কীভাবে এমন মনঃসংযোগ ধরে রেখেছিলেন তিনি? এক মাস আগে শেষ হওয়া বিশ্বকাপে আটটি গোল আর চারটি অ্যাসিস্ট কীভাবে করেছিলেন এই মানসিক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে?




