ব্রাজিল ছন্দে মধ্যমণি ভিনি

বিশ্বকাপের আগের কথা। তিনি আসলে ছিলেন পার্শ্বচরিত্র, অর্থাৎ মূল গল্পের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন শিল্পী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেই হয়ে উঠেছেন গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। যখন ব্রাজিলের প্রয়োজন একজন পথপ্রদর্শকের, তখন ভিনিসিয়ুস বাড়িয়ে দিয়েছেন কাঁধ। তিনিই এখন সেলেসাওদের আশার বাতিঘর। অন্ধকারে আলো হয়ে দাঁড়াচ্ছেন, সংশয় উড়িয়ে বিশ্বাস ফিরিয়ে দিচ্ছেন আর কোটি মানুষের স্বপ্ন বুকে নিয়ে ছুটছেন হেক্সা মিশনে।
সেই প্রথম ম্যাচ থেকেই যেন ভিড়নিসিয়ুস খেলছেন রিয়ালের জার্সি গায়ে। কখনো ব্রাজিলের জার্সিতে নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি। বিশ্বকাপের আগে ৪৯ ম্যাচে ছিল মাত্র ৯ গোল। বিশ্বকাপ শুরু হতেই ম্যাজিকের মতো রিয়াল তারকা হয়ে গেলেন ব্রাজিলের। তিন ম্যাচে চার গোল করে উতরে দিলেন পুরো গ্রুপ।
মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের খেলা দেখে যারা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাদেরই ফের স্বপ্নের ট্রেনে তুলে নিয়েছেন ভিনিসিয়ুস। সে ম্যাচে গোল করে ১ পয়েন্ট এনে দিয়েছিলেন। হাইতির বিপক্ষেও পান গোলের দেখা। গ্রুপসেরা হতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাস্ট উইন ম্যাচে করলেন জোড়া গোল। দুর্ভাগ্যবশত হ্যাটট্রিকটা পাননি।
প্রথম দুই ম্যাচে সেলেসাওদের খেলায় আশ্বস্ত হতে পারেননি সমর্থকরা। মরক্কোর বিপক্ষে ড্রয়ের পর হাইতির ম্যাচ জিতেছে; তবে কোথাও যেন রঙের খামতি ছিল, সুরটাও ঠিক ধরা দিচ্ছিল না। রাজ্যের উদ্বেগ সঙ্গী করে স্কটল্যান্ড ম্যাচ খেলতে নামা ব্রাজিলকে ভিনিসিয়ুস ফিরিয়েছেন সাম্বার ছন্দে। বিশ্বকাপ জিততে পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। এখন থেকে জিততে হবে ঠিক পাঁচটি ম্যাচ। ভিনি শেষ পর্যন্ত কতটা টেনে নিতে পারবেন, তা বলে দেবে সময়। তবে এখন পর্যন্ত ভিনিতেই উঁকি দিচ্ছে বড় স্বপ্ন। অভিজ্ঞ কোচ কার্লো আনচেলত্তি চিরায়ত প্রেসিং ফুটবল খেলাচ্ছেন না এই দলকে দিয়ে। দলের সীমাবদ্ধতা জেনেই প্রতিপক্ষকে বেশি খেলার সুযোগ দেওয়ায় ঝোঁক তার। প্রতিপক্ষ খেলবে, সুযোগ বুঝে বসাতে হবে মরণকামড়। আর এ কৌশল বাস্তব রূপ দিতে আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় অস্ত্র নিঃসন্দেহে পুরনো শিষ্য ভিনিসিয়ুস।
স্কটল্যান্ড ম্যাচে বল পায়ে ব্রাজিলিয়ানদের ভুলটা কমেছে, মাঝমাঠে কর্তৃত্ব বেড়েছে আর বেড়েছে আক্রমণে গতি। সব দ্বিধা কাটিয়ে মাঠে ব্রাজিলের প্রাণবন্ত উপস্থিতি। এসবের যোগফলে ষষ্ঠ মিনিটে ভিনিসিয়ুস এগিয়ে নেন দলকে। একদম কুড়িয়ে পাওয়া গোল। স্কটিশ ডিফেন্ডার ম্যাকেইনার শট ব্রাজিলের রাইনার পায়ে লেগে ভিনির কাছে গেলে স্কটিশদের সর্বনাশের শুরু। গোলকিপারকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে পৌঁছে দিতে ভুল হয়নি ভিনির। এ গোলেই সুর-তাল একদম ঠিকঠাক। বিরতিতে যাওয়ার আগে আরেকবার সফল তিনি গিমারেসের ক্রসে লক্ষ্যভেদী হেডে।
গ্রুপের তিন ম্যাচেই গোল করে অগ্রজদের পথে হেঁটে ভিনি দেখাচ্ছেন বিশ্বকাপ জয়ের আশা। অন্তত ইতিহাস সে কথাই বলছে। বিশ্বকাপে তিন গ্রুপ ম্যাচেই গোল করা ব্রাজিলিয়ান তারকাদের এলিট তালিকায় নাম লিখিয়েছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এর আগে ১৯৭০ বিশ্বকাপে জর্জিনিও, ১৯৯৪ বিশ্বকাপে রোমারিও এবং ২০০২ বিশ্বকাপে রোনালদো নাজারিও ও রিভালদো এ কীর্তি গড়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, সেই তিনবারই কাপ জিতেছে ব্রাজিল। উত্তরটা সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়ে আপাতত উদযাপনে মেতেছেন ভিনিসিয়ুস। স্কটল্যান্ডের রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, সেলেসাওদের নতুন নায়ক তিনি। রাফিনিয়ার চোটে যে শঙ্কার মেঘ জমেছিল, ঝোড়ো হাওয়ায় সেটি সরিয়ে দিয়েছেন ভিনি, ‘দলকে গোল করে জেতাতে পেরে ভীষণ আনন্দিত। আজ তো হেডেও একটা গোল করে ফেললাম! কোচকে কথা দিয়েছিলাম হেডে গোল করব। উনি হেসে বলেছিলেন, এটা নাকি আমার জন্য প্রায় অসম্ভব (হাসি)। তবে এটাও বলেছিলেন, করতে পারলে একটা উপহার দেবেন। এখন উপহার পাওয়ার পালা। তবে আনন্দ হলেও পা দুটি মাটিতেই রাখছি।’
একসময় যে ভিনিসিয়ুস ছিলেন শুধুই সম্ভাবনা, আজ তিনি ব্রাজিলের স্বপ্ন।




