ছায়া থেকে আলোয় ওয়ারসাবাল

লামিন ইয়ামাল
কোনো গোল নেই। অ্যাসিস্টও নেই। তারপরও অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারানো ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার লামিন ইয়ামালের। ম্যাচে তার প্রভাব বোঝা যায় এ থেকেই। ম্যাচের একটা বড় সময় ইয়ামালকে উইংয়ের দিকে ফাঁকায় রাখার চেষ্টা করেছে স্পেন, যেন ওয়ান-টু-ওয়ানে প্রতিপক্ষকে বোকা বানাতে পারেন তিনি। দারুণ কাজ করেছে এই কৌশল।
ইয়ামাল ভেতরে ঢোকার সময় অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগ সংকুচিত হয়ে পড়ছিল। তাতে রোদ্রি ও পেদ্রি খেলায় আরও বেশি জায়গা পান। স্পেনও তাদের সেই চিরচেনা গতিতে ফোটাতে থাকে পাসের ফুল। আর অসহায় হয়ে পড়ে অস্ট্রিয়া। এতটাই যে স্পেনের পোস্টে একটিও শট লক্ষ্যে ছিল না তাদের। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে আর্জেন্টিনাও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি কোনো শট। ১২ বছর পর এবারই প্রথম কোনো দল নকআউটে লক্ষ্যে রাখতে পারেনি কোনো শট।
অথচ দাপটে খেলা স্পেন পোস্টে ২৩ শট নিয়ে লক্ষ্যে রেখেছিল ১০টি। তারা গোল পায় ৩টি। ২০১০ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে এতদিন জয় পায়নি স্পেন। ব্যর্থতার সেই বৃত্ত ভেঙে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট পেল তারা। স্পেনের হয়ে জোড়া গোল মিকেল ওয়ারসাবালের। অন্য গোলটি পেদ্রো পোরোর।
রিয়াল সোসিয়েদাদ ফরোয়ার্ড মিকেল ওয়ারসাবাল ৪ গোল করেছেন এবারের বিশ্বকাপে। তবে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ের বদলে দলের জয়ই গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে, ‘আশা করছি আমাকে আর গোল করতে হবে না। দলের জয়ই আসল ব্যাপার। আমি সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া নিয়ে মোটেও ভাবছি না। আমরা কঠোর পরিশ্রমের ফল পেয়েছি আর খেলেছি নিখুঁত ফুটবল। এখন খেলতে হবে সেরা সব দলের বিপক্ষে। আমরা এজন্য তৈরি।’
বিশ্বকাপের আগে ইয়ামালকে নিয়ে মাতামাতিতে ছায়ায় ঢাকা পড়েছিলেন ওয়ারসাবাল। তবে অাসল কাজটা করছেন তিনিই। পুরো ক্যারিয়ারটাই ২৯ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার কাটিয়েছেন সোসিয়েদাদে। স্পেনের এই ক্লাব চ্যাম্পিয়নস লিগে না খেলায় বিশ্বব্যাপী পরিচিতি নেই তার। তারপরও স্পেনের হয়ে সর্বশেষ ১৬ ম্যাচে ১৭ গোল করা এই ফরোয়ার্ডকে স্পেনের সময়ের সেরা মেনে নিলেন বিশ্বকাপজয়ী স্প্যানিশ তারকা দাভিদ ভিয়া, ‘স্পেনের বাইরে কেউ তাকে সেভাবে জানে না কিন্তু আমরা জানি ওয়ারসাবাল স্পেনের সময়ের সেরা ফরোয়ার্ড। ও শার্কের মতো ধূর্ত।’
শেষ ষোলোয় তাদের সামনে এখন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। ফাইনালে পৌঁছাতে হলে শুধু পর্তুগাল নয়, হারাতে হবে ফ্রান্সকেও। প্রতিটি ম্যাচই তাই অগ্নিপরীক্ষা। আর এজন্য প্রস্তুত লামিন ইয়ামাল, ‘চোটের ধকল কাটিয়ে ধীরে ধীরে আমার নিজের চেনা ছন্দে ফিরছি। আসল অগ্নিপরীক্ষা এখনই। আপনি চাইলে হেরে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন, কিন্তু আমাদের কেউই তা চায় না। কোনো স্প্যানিয়ার্ড সমর্থকও চায় না। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়াই করব।’
সেই সঙ্গে ইয়ামাল জানালেন বিশ্বকাপ শিরোপাতেই চোখ তার, ‘কোনো শিশু যখন ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখে, সে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নই দেখে। এজন্যই আমি এখন এখানে। এগিয়ে যেতে চাই আরও সামনে আর জিততে চাই শিরোপাটা।’
দুই বিশ্বকাপ মিলে টানা পাঁচ ম্যাচে গোল হজম না করার রেকর্ডও গড়েছে স্পেন। এর আগে ইতালি ও সুইজারল্যান্ডেরই শুধু ছিল বিশ্বকাপে টানা পাঁচ ম্যাচে গোল না খাওয়ার কীর্তি। এর নায়ক স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমন। বিশ্বকাপে টানা ৫১৯ মিনিট কোনো গোল হজম না করার রেকর্ড গড়েন তিনি। পেছনে ফেলেন ইতালির কিংবদন্তি গোলকিপার ওয়ালতার জেঙ্গার ৫১৮ মিনিটের রেকর্ড।
ইউরোপের কোনো দলের বিপক্ষে টানা ১ হাজার ১৯৩ দিন অপরাজিত থাকার কীর্তিও গড়েছে স্পেন। ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ স্কটল্যান্ডের কাছে ২-০ গোলে হেরেছিল তারা। এর পর থেকে ইউরোপিয়ান দলের বিপক্ষে তারা অজেয়। শেষ ১৬-তে পর্তুগালের বিপক্ষে এই যাত্রা থামবে না তো?




