কার বিদায় আজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একজনের বয়স ৪১, আরেকজনের ৪০। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন দুই কিংবদন্তি। একজনের যাত্রা শেষ হবে রাউন্ড অব ৩২-এ। পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া লড়াই ছাপিয়ে ম্যাচটি তাই ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচের আকর্ষণীয় লড়াই।
২০১২ থেকে ২০১৮, রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে একসঙ্গে ইউরোপ শাসন করেছেন তারা। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে কাটানো সেই সোনালি দিনগুলোয় রোনালদো-মদরিচ জুটি জিতেছে চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, অসংখ্য ট্রফি আর জমা করেছেন অগণিত স্মৃতি। রোনালদো গোল করতেন, আর সেই গোলের পেছনে থাকত মদরিচের নিখুঁত পাস।
মাদ্রিদের সেই সোনালি দিন রোনালদো-মদরিচ পেছনে ফেলেছেন অনেক আগেই। বন্ধুত্ব ভুলে ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ফুটবলের দুই মহাতারকা। লড়াইটা নিজের দলকে বিশ্বকাপে টিকিয়ে রাখার।
৪১ বছর বয়সেও রোনালদো প্রমাণ করে চলেছেন, বয়স শুধুই একটি সংখ্যা। রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে গড়েছেন অনন্য এক রেকর্ডও। ছয় ভিন্ন আসরে গোল করা একমাত্র ফুটবলার তিনি।
এবারের বিশ্বকাপে তিন ম্যাচে রোনালদো করেছেন দুটি গোল। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫-০ এর জয়ে ছিলেন ম্যাচসেরা। যদিও ডিআর কঙ্গো ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালের ড্রয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। অনেকেই বলছেন, রোনালদোর অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট ও ডিফেন্সিভ অবদান আগের মতো নেই। তবে বড় ম্যাচে তার উপস্থিতিই প্রতিপক্ষের জন্য বড় আতঙ্ক।
পঞ্চম ও শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন মদরিচ। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচেই অধিনায়ক হিসেবে ছিলেন শুরুর একাদশে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রত্যাশিত ফল না এলেও পানামা ও ঘানার বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ায় তার দল। ঘানার বিপক্ষে ম্যাচে অ্যাসিস্ট করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার হিসেবে অ্যাসিস্টের রেকর্ডও গড়েন তিনি।
বয়স ৪০ পেরোলেও ২০১৮ সালে গোল্ডেন বল জয়ী এই মাঝমাঠের জাদুকর এখনো ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন অনায়াসেই। বল দখল, খেলার ছন্দ বদলে দেওয়া এবং চাপের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া; এখনো বিশ্বের সেরাদের একজন তিনি।
পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া এর আগে বিশ্বকাপে কখনো মুখোমুখি হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই দলের দেখা হয়েছে আটবার। মুখোমুখি লড়াইয়ে এগিয়ে আছে পর্তুগিজরাই। তারা জিতেছে সাত ম্যাচে, ক্রোয়েশিয়ার জয় মাত্র একটিতে। দুই দল সবশেষ মাঠে নেমেছিল ২০২৪ সালে। সেখানে ক্রোয়েশিয়া ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল।
রবার্তো মার্তিনেসের পর্তুগালের দলটি সবদিকেই বেশ ভারসাম্যপূর্ণ। ব্রুনো ফের্নান্দেস, ভিতিনিয়া ও জোয়াও নেভেস বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে দ্রুত আক্রমণ গড়ে তোলেন। দুই উইং দিয়ে রাফায়েল লেও ও বের্নার্দো সিলভা জায়গা তৈরি করেন, আর বক্সে শেষ কাজটি করেন রোনালদো।
অন্যদিকে জ্লাতকো দালিচের ক্রোয়েশিয়া অনেক বেশি ধৈর্যশীল। মদরিচ ও মাতেও কোভাচিচ মাঝমাঠে বলের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন, আর ইয়োস্কো গার্দিওল নেতৃত্ব দেন রক্ষণে। বড় ম্যাচে রক্ষণ সংগঠিত রেখে সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে ওঠা তাদের প্রধান কৌশল।
এই ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারণ করবে মাঝমাঠের লড়াই। যদি মদরিচ খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে ক্রোয়েশিয়া ম্যাচকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবে। আর যদি ভিতিনিয়া-ব্রুনোরা দ্রুত বল সরিয়ে রোনালদোকে সুযোগ তৈরি করে দিতে পারেন, তাহলে পর্তুগাল এগিয়ে থাকবে।
একদিকে রোনালদো, অন্যদিকে মদরিচ। টরন্টোতে ৩ জুলাই ভোর ৫টায় দুজনই শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে একে অন্যের বিপক্ষে নামছেন। তাই এই ম্যাচে জয়-পরাজয়ের বাইরেও থাকবে আবেগ ও স্মৃতির পসরা। ছোট একটি মুহূর্ত, একটি ফ্রি-কিক, একটি নিখুঁত পাস কিংবা একটি হেড; এসবই হয়তো ঠিক করে দিতে পারে, কার বিশ্বকাপের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে, আর কোন কিংবদন্তির অধ্যায়ের সমাপ্তি হবে।




