আসল নায়ক

ফাইল ছবি
ডিয়েগো ম্যারাডোনা আকাশের তারা হয়েছেন অনেক দিন। তারপরও আর্জেন্টিনা ফুটবলকেন্দ্রিক আলোচনায় তিনি ফিরে আসেন, আসছেন, আসবেনও। জীবদ্দশায় তার এক উক্তি দিয়ে শুরু করা যাক— ‘স্কালোনি ভালো মানুষ। তবে ও ট্রাফিকও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।’
২০১৮ বিশ্বকাপে ব্যর্থ হওয়ার পর আর্জেন্টিনা দলের দায়িত্ব হারান হোর্হে সাম্পাওলি। তারই সহকারী লিওনেল স্কালোনিকে সেই সময় অন্তর্বর্তী কোচের দায়িত্ব দেয় আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন। এ সিদ্ধান্তে বেজায় ক্ষেপেছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর। সমালোচনায় মুখর হয়ে করেছিলেন ভবিষ্যদ্বাণী। সমর্থকরাও স্কালোনিকে সরানোর দাবি জানিয়েছিলেন জোরেশোরে।
স্কালোনি সমালোচনার তীরে ক্ষতবিক্ষত হলেও নিজের কাজটা করে গেছেন। কী করেছেন, কীভাবে করেছেন— সে আলোচনা চাপা পড়ে কাতার বিশ্বকাপ জয়ে।
শিরোপা জিতে আসার পর থেকেই স্কালোনির ওপর বিশেষ ভরসার কারণে পুরো দলের নাম হয় ‘লা এস্কালোনেতা’। এ বিশেষণে গর্ব আছে, আছে অস্বস্তিও। এত বড় স্থানে নিজেকে ভাবতে চান না; মাটিতেই রাখতে চান পা। তার কাছে ফুটবল— দিন শেষে স্রেফ একটা খেলা আর তাদের দায়িত্ব মানুষকে বিনোদিত করা ছাড়া আর কিছু নয়। মাটিতে পা রেখে আরেকটি বিশ্বকাপের শুরুর টার্মিনালে পৌঁছে গেছে এস্কালোনেতা গাড়ি।
বয়সের সঙ্গে বেড়েছে অভিজ্ঞতাও। অভিযান শুরুর দিনটি যতই এগিয়েছে, ক্রমেই বাড়ছে শিরোপা ধরে রাখার চাপও। চার বছর আগে যে পথে হেঁটে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বজয়ী দলে বদলে ফেলেছিলেন, এবারও সেই কাজটা করতে হবে সুচারুরূপে এবং অবশ্যই সেই লিওনেল মেসিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে।
মেসির বিশ্বকাপ অভিষেক ২০০৬ সালে। পেকারম্যানের সেই দলে স্কালোনিও ছিলেন। পরেরবার মেসিকে ঘিরে ম্যারাডোনার সাফল্য কৌশল ভেস্তে যায়। ২০১৪-তে আলেহান্দ্রো সাবেয়ার অধীনে মেসি দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনালে। তবে পরম আদরে শিরোপায় চুমু এঁকে দেওয়া হয়নি। রাশিয়ায় চার বছর পর সাম্পাওলি-মেসি জুটিও ব্যর্থ। অধরা শিরোপার দেখা পান স্কালোনির সঙ্গে জুটি গড়ে, কাতারে।
সাম্পাওলির বিদায়ের পর দায়িত্বের প্রস্তাব এলে মেসির পরামর্শ চেয়েছিলেন স্কালোনি। পুরো বিষয়টাই ‘হাস্যকর’ মনে হয়েছিল মেসির কাছে। রাশিয়া বিশ্বকাপ ব্যর্থতায় তখন আকাশি-নীল জার্সিতে মন উঠে গেছে। মেসি চলে গিয়েছিলেন অনির্দিষ্টকালের বিরতিতে। অন্তর্বর্তী দায়িত্ব নিয়ে স্কালোনি মেসিকে ফেরানোর কৌশল নেন। পেকারম্যান, ম্যারাডোনা, সাবেয়া, সাম্পাওলির মতো পরীক্ষিত এবং সর্বজন-স্বীকৃত কোচরা যা পারেননি, অখ্যাত, আনকোরা স্কালোনি কী করে পারলেন? ২০২২ বিশ্বকাপের পর বিখ্যাত কলামিস্ট গুস্তাভো পিসানি লিখেছেন, ‘স্কালোনি দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়কে নিবিড়ভাবে চিনতেন। তিনি সবার আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি সর্বকালের সেরা মেসির আস্থা অর্জন করেছিলেন।’
স্কালোনি সন্তর্পণে মেসির জন্য বিশেষ একটা কৌশল বের করেন। মেসির বয়স বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে দলের খেলার ধরন বদলে ফেলেন। মেসির চারপাশে রদ্রিগো দে পল, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনসো ফের্নান্দেসের মতো কঠোর পরিশ্রমীদের রাখেন। তাতে রক্ষণ সহায়তায় ছোটাছুটি করতে হয়নি মেসিকে। মাঠে স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ করে দেওয়া হয়, যাতে শক্তি বাঁচিয়ে যেকোনো মুহূর্তে জাদু দেখাতে পারেন।
মেসিকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও গড়ে নিয়েছিলেন স্কালোনি। তরুণদের এমন এক মানসিকতায় তৈরি করেন, যেন সবাই মেসিকে সম্মান করে, আবার তার জন্য মাঠে সেরাটা দিয়ে দিতে প্রস্তুত থােক। কাতারে সেটাই হয়েছে।
এবারও স্কালোনির সব পরিকল্পনা মেসিকে ঘিরে। শিরোপা ধরে রাখার চাপ আছে, তবে মেসির মতোই ফুটবলকে স্রেফ উপভোগ্য করে তোলায় গুরুত্ব দিয়েছেন কোচ। আগামীকাল বুধবার কানসাসে আরেকবার তিনি বসবেন ড্রাইভিং সিটে। গর্জে উঠবে এস্কালোনেতা গাড়ি। সবার স্বপ্ন ছুটতে ছুটতে সে গাড়ি পৌঁছাবে ফাইনালের মহামঞ্চে।
পরের কাজটা করে দিতে গাড়ির সামনের সিটে তো বসে আছেন মেসি; আগের মতোই সাফল্য ছোঁয়ার প্রবল ইচ্ছাশক্তি নিয়ে। তিনিও নিশ্চয়ই চাইবেন স্কালোনিকে নিয়ে ম্যারাডোনার সেই উক্তিকে আরেকবার ভুল প্রমাণ করতে।




