মুকুট ফেরানোর অভিযানে জার্মানি

সংগৃহীত ছবি
জার্মানির ফুটবলকে বলা হতো যন্ত্র। কখনো হাল ছাড়ত না তারা। তাই অমর হয়ে যায় ইংলিশ কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকারের সেই বাণী, ‘ফুটবল একটি সহজ খেলা, ২২ জন মানুষ ৯০ মিনিট বলের পেছনে ছোটে এবং শেষ পর্যন্ত জার্মানিই জেতে।’
সেই জার্মানিই পথ হারিয়ে ফেলেছে ২০১৪ বিশ্বকাপের পর। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে তারা ছিটকে পড়ে প্রথম রাউন্ড থেকে! এমন ব্যর্থতায় সেই লিনেকারের হতাশা, ‘জার্মান যন্ত্র ঠিকঠাক কাজ করছে না।’
যন্ত্র বিকল হওয়াতেই জার্মানির সেই চেনা আধিপত্য আর নেই। বিশ্বকাপ এখন নতুন প্রজন্মের ব্যর্থতার নাম। অথচ ১৯৫৪ থেকে ২০১৪ বিশ্বকাপ পর্যন্ত কখনো কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বাদ পড়েনি চারবারের চ্যাম্পিয়নরা। এরপর ২০১৮ বিশ্বকাপে যখন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে জার্মানি গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়, সেটি ছিল বড় এক ধাক্কা। তারা যে নিজেদের চেনা পথ হারিয়ে ফেলেছে, তা একদম স্পষ্ট হয়ে যায় ম্যাচের শেষ মুহূর্তে নিজেদের গোলপোস্ট থেকে ৮০ গজ দূরে মানুয়েল নয়ারের বল হারানোর দৃশ্যে।
কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আজ শুরু হচ্ছে সেই জার্মানির মুকুট ফিরে পাওয়ার অভিযান। তাদের গ্রুপে আরও আছে ইকুয়েডর ও আইভরি কোস্ট। এবার সেরা তৃতীয় আট দলের পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ থাকায় অন্তত গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ার দুঃস্বপ্নের কথা ভাববেন না জার্মান সমর্থকরা।
বিশ্বকাপজয়ী কোচ জোয়াকিম লো আর হান্সি ফ্লিকের হাত ধরেও ব্যর্থতা কাটাতে পারেনি তারা। ২০২২ বিশ্বকাপে কোস্টারিকার বিপক্ষে জয়ের পরও যখন জার্মানি বিদায় নিল, তখন ফ্লিক জার্মান ফুটবলের দুর্বলতাগুলোর দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে আমরা শুধু নতুন গোলকিপার এবং নতুন উইং-ব্যাক নিয়ে কথা বলছি। অথচ জার্মান ফুটবলের মূল শক্তিই ছিল আমাদের রক্ষণভাগ। আমাদের ফুটবলের একদম মৌলিক জায়গাগুলোতে ফিরে যেতে হবে।’
বিশ্বকাপের আসল রাজা হিসেবে চারবারের চ্যাম্পিয়নদের যে খ্যাতি ছিল, সেটি ফিরিয়ে আনা এবার চ্যালেঞ্জ ইউলিয়ান নাগলসমানের নতুন জার্মানির। তবে চার বছর পর জার্মানি আবার সেই পুরনো গোলকিপারের কাছেই ফিরে গেছে।’
নাগলসমানের অধীনে ২০২৪ সালের ইউরো কাপের পারফরম্যান্সের সঙ্গে ২০০৬ বিশ্বকাপে ক্লিন্সম্যানের জার্মানি দলের বেশ মিল ছিল; নিজেদের মাটিতে যেন একটি নতুন জাগরণের ইঙ্গিত। যদিও শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেনের কাছে হেরেই কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের পথচলা থেমে যায়। তারপরও অনেকে মনে করেন, স্পেনের পর জার্মানিই ছিল সেই টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সেরা দল।
গত গ্রীষ্মে নেশনস লিগে পর্তুগাল ও ফ্রান্স এরপর সেপ্টেম্বরে স্লোভাকিয়ার কাছে টানা তিনটি পরাজয়ের পর সেই তৈরি হওয়া ইতিবাচক আবহ কিছুটা ম্লান হয়েছিল ঠিকই। তবে টানা ৯ জয়ে বিশ্বকাপে আসায় জার্মানির পুরনো দাপট নিয়ে আশাবাদী হতেই পারেন ভক্তরা।
১৯৭০ বিশ্বকাপে পেলে, জায়ারজিনহোরা ব্রাজিলকে শিরোপা জিতিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু সেই বিশ্বকাপে একাই ১০ গোল করেছিলেন জার্মানির জার্ড মুলার। এরপর ক্লিন্সমান, ক্লোসারাও আলো ছড়িয়েছেন বিশ্বকাপে। বাস্তবতা হলো, জার্মানির এই দলে এমন বিধ্বংসী কোনো স্ট্রাইকার নেই। কাই হাভার্টজ, নিক ভোল্টেমাডে, ম্যাক্সিমিলিয়ান বায়ার, ডেনিজ উনডাফদের কেউ জ্বলে উঠলেই বিশ্বকাপে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে পারে জার্মানি।
এ ছাড়া দলে আছেন জামাল মুসিয়ালা— যিনি গত বিশ্বকাপে জার্মানির সেরা পারফরমার ছিলেন। ফ্লেরিয়ান ভির্টস, লেরয় সানেরাও ঘুরিয়ে দিতে পারেন ম্যাচের মোড়। নাগলসমানের দলের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করবে তিনি জার্মানির এই আক্রমণাত্মক প্রতিভাদের কীভাবে কাজে লাগাচ্ছেন তার ওপর।
২০২৪ সালের ইউরোর পর ইলকাই গুন্দোগান, টনি ক্রুস ও থমাস মুলার আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন। এই তরুণ দলটির টুর্নামেন্টের বড় মঞ্চে লড়াই করার অভিজ্ঞতা হয়তো কিছুটা কম, তবে তাদের সুবিধা হলো— ২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ব্যর্থতার কোনো গ্লানি বা মানসিক চাপ তাদের ছুঁয়ে যায়নি। এটাও হতে পারে সাফল্যের রসদ।


