সেঞ্চুরির মাইলস্টোনে দাঁড়িয়ে স্কালোনি

সংগৃহীত ছবি
লিওনেল স্কালোনি তখন ভ্যালেন্সিয়ার একটি সৈকত ধরে হাঁটছিলেন। তার পাশে থাকা পাবলো আইমার মজা করে বলছিলেন, ‘তুমি জানো তো, তুমি একটা পাগল?’
স্কালোনি তখন দায়িত্ব পেয়েছিলেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রধান কোচের। আর তার সহকারী ছিলেন আইমার। দুজন মিলে তাড়াহুড়ো করে গুয়াতেমালার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের জন্য স্কোয়াড তৈরি করছিলেন।
এরপর প্রায় আট বছর কেটে গেছে। এখন স্কালোনি হাঁটেন কানসাস সিটির 'কম্পাস মিনারেলস সেন্টার'-এর একটি মাঠের ওপর দিয়ে। আইমার থাকেন তার পাশেই। গরমটা সেই আগের মতোই আছে, তবে এবার তাদের গায়ে ভূমধ্যসাগরের জলকণা ছিটকে আসছে না, বরং আসে এই কমপ্লেক্সের স্প্রিংকলার (পানি ছিটানোর যন্ত্র) থেকে। বিশ্বকাপের বেস ক্যাম্প হিসেবে আর্জেন্টিনা বেছে নিয়েছে এই ক্যাম্পকেই।
কানসাস সিটি থেকে আর্জেন্টিনা এখন মায়ামিতে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচটা আর্জেন্টিনা খেলবে এই শহরে-যা হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ হিসেবে স্কালোনির শততম ম্যাচ।
জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে স্কালোনি বলেছিলেন, ‘আমি জীবনেও এটা কল্পনা করিনি। এই জার্সিতে এতগুলো ম্যাচে ডাগআউটে থাকা সত্যিই এক বিশাল সংখ্যা। এটি আমার জন্য ভীষণ স্পেশাল একটি মুহূর্ত।'
তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবলের সেই অর্থহীন বিভাজনকে দূর করতে পেরেছিলেন-যে বিভাজনটি অনেকটা অলিখিত নিয়মের মতো মানুষকে বাধ্য করত লুইস মেনত্তি অথবা কার্লোস বিলার্দোর যেকোনো এক পক্ষ বেছে নিতে। আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের (মে ১৯৭৮) ঠিক আগে তার জন্ম । ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় দেখেছেন দিদার বাড়ির টিভিতে। আর ২০২২ সালে কাতারে তিনি নিজেই দেশের জার্সিতে তৃতীয় তারকাটি জুড়ে দেন। তিনি মেনত্তি ও বিলার্দো-দুই ঘরানার সেরা দিকগুলোর সমন্বয় ঘটিয়ে ইতিহাসের অন্যতম সফল জাতীয় দল হিসেবে তুলেছেন লিওনেল মেসিদের।
তিনি জিতেছেন চারটি শিরোপা (দুটি কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা আর বিশ্বকাপ)। জেতার পর, তিনি চাইলেই সেইসব সমালোচকদের মুখের ওপর জবাব দিতে পারতেন-যারা তার নিয়োগকে ভুল মনে করেছিলেন। এখন সেই দায়িত্বই তাকে গিয়ের্মো স্তাবিলের রেকর্ডের (দুই মেয়াদে ১২৪টি ম্যাচ) একদম কাছাকাছি নিয়ে গেছে।
অনেকে বলেন ফুটবলে নতুন করে আবিষ্কার করার মতো আর কিছু বাকি নেই, সবকিছুই নির্ভর করে ঘুঁটিগুলো কীভাবে সাজানো হচ্ছে তার ওপর। স্কালোনির দল পরিচালনার ধরন এতটাই ধারাবাহিক যে, ২০১৮ সালে গুয়াতেমালার বিপক্ষে তার প্রথম ম্যাচে এবং এই বিশ্বকাপে জর্ডানের সঙ্গে তার ৯৯তম ম্যাচে-তিনি মাঝমাঠের একই তিন খেলোয়াড়কে খেলিয়েছিলেন (এজেকুয়েল পালাসিওস, লিয়েন্দ্রো পারেদেস এবং লো চেলসো)। তবে এই কোচিংয়ের মেয়াদে ৬৫ জন খেলোয়াড়ের আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেকও হয়েছে।
স্কালোনির গড়ে তোলা সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটি হলো দলের একটি নিজস্ব 'পরিচয়'। তিনি প্রতিভাকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন, দলের ভারসাম্য খুঁজেছিলেন এবং 'অন্য' লিওনেলের (মেসি) জন্য একটি কার্যকর পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে একটি বার্তা দিয়েছিলেন, জাতীয় দলের একটি ম্যাচই জীবনের সবকিছু নয়। দলের ওপর থেকে বাড়তি চাপ এবং প্রত্যাশার বোঝা অনেকটাই কমে গিয়েছিল তাতে। স্কালোনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি এই "স্কালোনিতা" (স্কালোনির দল)-র ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে হোর্হে সাম্পাওলির সহকারী থাকার সময়ই দলের আসল সমস্যাটা বুঝতে পেরেছিলেন স্কালোনি। কেন মেসি এবং দলের অন্যরা ক্লাবের হয়ে মাঠ কাঁপালেও জাতীয় দলের হয়ে পারফর্ম করতে পারছিলেন না, এটা বুঝেছিলেন তিনি? স্কালোনি সেই ধারাটা বদলে দেন। এখন পরিস্থিতি এমন যে, খেলোয়াড়রা আর্জেন্টিনার হয়ে কেমন খেলছেন, তার ওপর ভিত্তি করে ক্লাবে তাদের জায়গা পাকা হচ্ছে।
৩৯ বছর বয়সে একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের গ্রাফ নিচের দিকে নামার কথা, অথচ এই বিশ্বকাপেই মেসি খেলছেন সেরা ছন্দে। জাতীয় দলে এর আগে আটজন কোচের অধীনে খেলেছেন মেসি (পেকেরম্যান, বাসিলে, ম্যারাডোনা, বাতিস্তা, সাবেলা, মার্তিনো, বাউসা এবং সাম্পাওলি), কিন্তু কেউই স্কালোনির মতো তার সেরাটা বের করে আনতে পারেননি। স্কালোনির অধীনে মেসি ৭৪ ম্যাচে ৫৮টি গোল করেছেন (গড়ে ০.৭৮ গোল), যেখানে এর আগের ১২৮টি ম্যাচে তার গোল ছিল ৬৫টি (গড়ে ০.৫১ গোল)।
এই মহাতারকা স্কালোনির মাঝে কী এমন পেয়েছিলেন? স্কালোনি নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন,‘এই স্বস্তিটুকু দেওয়া যে, তার পাশে একদল বন্ধু আছে, এমন কিছু মানুষ যারা তার জন্য নিজেদের সবকিছু বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। যারা তাকে ঈশ্বরের মতো শ্রদ্ধা করলেও দিনশেষে পাড়ার একজন সাধারণ ছেলেই মনে করে।’
স্কালোনি সম্মান অর্জন করেছেন-বাইরের মানুষের কাছ থেকে তো বটেই, তবে সবচেয়ে বেশি দলের ভেতর থেকে। তিনি পুরোপুরি খেলোয়াড়দের একজন কোচ; তারা কী ভাবছে, কী অনুভব করছে, তাদের জীবনে কী ঘটছে-সবকিছুর খোঁজ রাখেন। যেমন এই বিশ্বকাপের প্রস্তুতি সফরের সময় অবার্ন-এ লাউতারো মার্টিনসের সঙ্গে টানা ৪০ মিনিট গল্প করেছিলেন। তবে একই সঙ্গে, দলে তার কোনো প্রিয়পাত্র নেই। তিনি যদি দেখেন নিকোলাস তালিয়াফিকোর চেয়ে ফাকুন্দো মেদিনা ভালো ফর্মে আছেন, তাহলে মেদিনাকেই বেছে নেন। ম্যাচের মাঝপথেও যদি তিনি দেখেন রোমেরো চোট পেয়ে অস্বস্তিতে আছেন, তবে তিনি তাকে মাঠ থেকে তুলে নিতে দ্বিধা করেন না।
এই মানসিকতাতেই দল পরিচালনা করে স্কালোনি এখন সেঞ্চুরির মাইলস্টোনের দুয়ারে।




