যুদ্ধ আর মূল্যস্ফীতি ছাপিয়ে বিশ্বকাপ

ডোনাল্ড ট্রাম্প হুংকার দিয়েছেন— ইরান আলোচনা করতে অনেক বেশি সময় নিচ্ছে, তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে। ওদিকে ওমান উপকূলে হরমুজ প্রণালিতে টহলরত একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ড্রোন আক্রমণে ভূপাতিত করেছে ইরান। গত মাস চারেকে হামের উপসর্গে বাংলাদেশে ৫৩৯ জন শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমগুলোতে এমন সব দুঃসংবাদেরই ছড়াছড়ি। তবে আজ থেকে এক মাসের জন্য যাবতীয় দুঃসংবাদ খানিকটা ঢাকা পড়বে বিশ্বকাপের চাদরে। চার বছর পরপর এই একটা উপলক্ষই যে মানুষকে জাগতিক সব যন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। পৃথিবী চলবে পৃথিবীর নিয়মেই। মানুষে মানুষে হানাহানি থাকবে, স্বজন হারানোর কষ্টও থাকবে; তবুও বেঁচে থাকার তাগিদেই বিশ্ব জুড়ে মানুষ দুদণ্ড স্বস্তি খুঁজবে লিওনেল মেসির পায়ের জাদুতে।
বিশ্বকাপ কিংবা অলিম্পিকের মতো বড় বৈশ্বিক আসরগুলোতে থাকে সম্প্রীতির বার্তা। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটির একজন ক্রীড়াবিদ আর সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্রের ক্রীড়াবিদ— দুজনই পান সমান মর্যাদা। ২০২৬ বিশ্বকাপ এই মূলমন্ত্রের পুরোই বিপরীত অবস্থানে। মূল আয়োজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ১০৪টি ম্যাচের ৭৮টিই হবে ট্রাম্পের দেশে।
সবচেয়ে বেশি বিধিনিষেধ তারাই আরোপ করে রেখেছে। কানাডার দুই শহরে হবে ১৩ ম্যাচ, বিশ্বকাপ নিয়ে কানাডার মানুষজনেরও খুব একটা আগ্রহ নেই। আরেক আয়োজক মেক্সিকো, তিন শহরে তারাও ১৩টি ম্যাচের আয়োজক। প্রচলিত অর্থে ফুটবল বলতে যে খেলাটাকে আমরা চিনি, তা নিয়ে আগ্রহ আছে একমাত্র মেক্সিকানদেরই। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল আয়োজন করা হয়েছিল যে অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে, প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে নতুন করে প্রস্তুত করা হয়েছে ৮৭ হাজার ৫০০ দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্থাপনা। বাকি দুই ভেন্যু মন্তেরে ও গুয়াদেলহারার স্টেডিয়াম ও নাগরিক অবকাঠামো উন্নয়নেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে মেক্সিকো সরকার। দুর্নীতি মেক্সিকোর সরকার কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। অভিযোগ এসেছে, এই ব্যয় অনেকটাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এসব ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে নিরাপত্তা খাতে। বিশ্বকাপ সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মোট ৬২৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। ওয়াশিংটনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই অর্থ তিন থেকে চার সপ্তাহ ধরে অবিরাম কাজ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওভারটাইমের জন্য ব্যয় করা হবে। কানাডার সরকারও জানিয়েছে, তারা ১৪৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে জননিরাপত্তা খাতে। এই অঙ্কগুলোই স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, বিশ্বকাপ এ দুই দেশের কাছে উৎসব নয় উপদ্রব।
উন্নত জীবনের আশায় বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই অভিবাসী হয়ে কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসার চেষ্টা করেন অনেকে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে আয়োজক দেশগুলো অনেক সময়ই ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করে, যেমনটা করেছিল কাতার ও রাশিয়া। বিশ্বকাপের ম্যাচ টিকিট থাকলেই দর্শকদের ভিসা দিয়েছিল গত দুই বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ।
এবার পুরো বিপরীত চিত্র। সাধারণ দর্শকের অনেকেই কানাডা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা ইরানের খেলোয়াড়দের যুক্তরাষ্ট্রে রাত যাপনের অনুমতি মেলেনি। তারা বেসক্যাম্প করে থাকবেন মেক্সিকোয়, ম্যাচের দিন বিমানে এসে খেলে সেদিনই তারা যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করবেন। দলসংশ্লিষ্ট অনেককেই ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র সরকার, টিকিট পাচ্ছেন না ইরানের সমর্থকরাও। ফিফা কর্তৃক মনোনীত ও বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনায় নিয়োগপ্রাপ্ত রেফারি ওমার আরটান সোমালিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালেও মায়ামি বিমানবন্দর থেকে তাকে ফেরত পাঠায় দেশটির শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা বিভাগ।
সোমালিয়ার একজন নাগরিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে থেকে যাবেন, সেই আশঙ্কাটা না হয় মেনে নেওয়া যায়; স্কটল্যান্ডের একজন নাগরিককে কেন বিশ্বকাপের খেলা দেখতে ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র— সেই প্রশ্ন তুলেছেন স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি। ব্রিটিশ পাসপোর্টধারীদের যুক্তরাষ্ট্রে ৯০ দিন পর্যন্ত অবস্থানের জন্য ইলেকট্রনিক সিস্টেম ফর ট্রাভেল অথরাইজেশনের (ইএসটিএ) প্রয়োজন পড়ে। স্কটল্যান্ডের খেলা দেখতে বিশ্বকাপে যেতে ইচ্ছুক অনেক ভক্তই জানিয়েছেন, তাদের ইএসটিএর অনুমোদন শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে হঠাৎ করে একটা ইমেইল পাই। তাতে জানানো হয় যে ‘আমার ইএসটিএ অনুমোদন হয়নি’— অবাক হয়েই বিবিসিকে জানিয়েছেন সপরিবারে বোস্টন যাওয়ার পরিকল্পনা করা ৪৩ বছর বয়সী স্কটিশ নাগরিক স্কট ব্রেইড।
ভিসার সমস্যাটা যে শুধু উন্নত বিশ্ব আর তৃতীয় বিশ্বে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া নজরদারির কারণে সেটি স্পষ্ট। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ভারপ্রাপ্ত সহকারী সচিব লরেন বিস-এর কথায়, ‘ট্রাম্প প্রশাসন এখন অভিবাসন আইনের প্রয়োগ ঘটাচ্ছে।
ভ্রমণকারীদের অবশ্যই সম্পূর্ণ এবং সত্য তথ্য প্রদান করতে হবে, যার মধ্যে সব অপরাধের ইতিহাসও অন্তর্ভুক্ত। কোনো গ্রেপ্তার বা সাজাপ্রাপ্তির তথ্য গোপন করা মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন হিসেবে গণ্য হবে, যা ইএসটিএ বাতিল, প্রত্যাখ্যান অথবা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার কারণ হতে পারে।’
ভিসা নিয়ে কড়াকড়ির পাশাপাশি দর্শকদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অন্যতম কারণ টিকিটের উচ্চমূল্য। ১৯৭২ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে মাঠে গিয়ে ইংল্যান্ডের খেলা দেখেন জেরার্ড বেক। সেই ম্যাচসহ বিশ্বকাপে গিয়ে দেখা ম্যাচের টিকিটের একটা অংশ সযত্নে জমিয়ে রেখেছেন তিনি। বিবিসিকে জেরার্ড জানিয়েছেন, এবার বিশ্বকাপ দেখতে তিনি যাবেন না। কারণ, টিকিট ও বিমান ভাড়ার অতিরিক্ত উচ্চমূল্য। তার কাছে এটা দর্শকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
কাতার ও রাশিয়া বিশ্বকাপে ম্যাচ টিকিটধারীদের জন্য আয়োজক শহরে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ছিল বিনামূল্যে, এবারের বিশ্বকাপে উল্টোছবি। ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, নিউ ইয়র্ক থেকে নিউ জার্সির ট্রেন ভাড়া যেখানে ছিল ১৩ ডলার, বিশ্বকাপ উপলক্ষে সেটি হয়েছে ৯৮ ডলার! ম্যাচের দিন গাড়ি স্টেডিয়াম এলাকায় পার্ক করতে খরচ হবে ম্যাচ ও ভেন্যু ভেদে ৭৫ থেকে ৩ হাজার ডলার পর্যন্ত।
৪৮ দলের অংশগ্রহণ, তিন দেশে আয়োজন— সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ হতে পারত ৯৬ বছরের ইতিহাসে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আয়োজন। তবে প্রথম ম্যাচের কিক-অফের বাঁশি বাজার আগেই ২০২৬ বিশ্বকাপ পেয়ে গেছে দর্শকদের জন্য সবচেয়ে গোলযোগপূর্ণ আর ব্যয়বহুল বিশ্বকাপের তকমা।




