শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে দুরকম প্রভাব পড়তে পারে

শিল্প ও কলকারখানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার হলে উৎপাদন হয়তো বাড়বে, কিন্তু একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। আবার অনেকে বলছেন, এরকম পরিস্থিতিতে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানও হতে পারে। তবে সেসব ক্ষেত্রে কেবল দক্ষ ও যোগ্যরাই টিকে থাকতে পারবেন।
জি অ্যান্ড আর কোম্পানির হয়ে একটি তৈরি পোশাকের কারখানা দেখতে গিয়েছি। তার সিইও আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাদের পিআরওর সঙ্গে। তিনি আমাকে ফ্যাক্টরি দেখাবেন। ডিজাইন আর কাটিংয়ের কাজ কম্পিউটারের সাহায্যে হয়, তা আমি আগেই জানতাম। কিন্তু সেলাইয়ের ফ্লোরে সারি সারি সেলাই মেশিন আর নারী-পুরুষের বদলে দেখা গেল রোবট আর কয়েকজন সুপারভাইজার। পিআরও জানালেন, শুধু তাদের কোম্পানিতেই নয়, প্রায় সবখানেই এই চিত্র। তার ফলে কাজের গতি যেমন বেড়েছে, পণ্যের মানও হয়েছে উন্নত।
ফ্যাক্টরি ভিজিট শেষে লাঞ্চের নেমন্তন্ন। রেস্তোরাঁতেও দেখলাম অ্যাপ আর রোবটের ব্যবহার। তাতে আমি একদিকে যেমন অভিভূত, অন্যদিকে একটু চিন্তিত হয়ে পড়লাম। রোবট যদি সব কাজ করে ফেলে, তাহলে শ্রমবাজারের লাখ লাখ মানুষের কী গতি হচ্ছে। আমাকে আশ্বস্ত করে পিআরও বললেন, ‘আমরা কাজের লোক খুঁজে পাই না বলেই তো এই ব্যবস্থা।’
লাঞ্চ শেষ করে পরের অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় দেখার জন্য হাতের আই ওয়াচ খুললাম। তাতে সময় আর তারিখের পাশে সাল ২০৫০! বিষয়গুলো মেলাতে না পেরে ভেতরে ভেতরে ঘেমে উঠলাম। যখন ঘুম ভাঙল তখন মনে পড়ল, একটি লেখার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
তথ্যপ্রযুক্তির ওপর ভর করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছে প্রায় এক দশক আগেই। এর মূল চালিকাশক্তি রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং বায়োটেকনোলজি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আর তার প্রভাব নিয়ে সারা বিশ্বে চলছে মহা হইচই। আর তাতে যে প্রশ্নটি জোরেশোরে উঠছে, তা হলো এই যে— এর ফলে কি কর্মজগতে নেমে আসবে মহাদুর্যোগ?
স্বপ্নে দেখা ২০৫০ সালের যে চিত্রটি দিয়ে এই লেখা শুরু করেছি, যদি তা বাস্তবে ঘটে— এবং তার আগেই বাংলাদেশের বিপুল বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয়— তাহলে বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। একসময় খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিল গেটসের মতো মানুষও পরামর্শ দিয়েছিলেন রোবটের ব্যবহারের ওপর কর বসাতে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমাবদ্ধতাগুলো বিবেচনায় নিলে মনে হয় না যে আগামী দু-তিন দশকে এমন পরিবর্তন ঘটে যাবে, যা আজ কল্পনাতীত। কোনো কোনো চাকরি যেমন থাকবে না, তেমনি আবার নতুন কাজও সৃষ্টি হবে। কেউ হারবে আর কেউ লাভবান হবে
নতুন এবং উন্নত প্রযুক্তি মানুষের কাজ নিয়ে নেবে কি না— এই প্রশ্ন কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাসে বেশ পুরনো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটের ব্যবহারের ফলে কর্মজগতে কী প্রভাব পড়তে পারে, এসব বিষয়ে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণায় কেউ বলেনি যে আগামীকাল বা আগামী বছরই রোবটরা সবার চাকরি নিয়ে নেবে। তবে মোটা দাগে বলা হয়েছে, সব পেশার একটি ক্ষুদ্র অংশই সম্পূর্ণভাবে রোবটের মাধ্যমে করা যাবে। আর সব খাতে নয়, কোনো কোনো খাতে— যেমন শিল্প, পরিবহন ও গুদামজাতকরণ, পাইকারি ও খুচরা বিক্রি, আর্থিক সেবা এসব খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তির ব্যবহার বেশি সম্ভব। কবে নাগাদ এ ধরনের সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত হতে পারে, সে বিষয়ে কেউ জোর দিয়ে কিছু না বললেও অনেকেই মনে করেন যে আগামী তিন-চার দশকে এই প্রক্রিয়া দ্রুত হতে পারে।
নতুন প্রযুক্তি এবং যান্ত্রিকীকরণের ইতিহাস কী বলে?
আগেকার শিল্পবিপ্লবগুলোর সময় যান্ত্রিকীকরণের ফলে চাকরি কমেনি, বরং বেড়েছে। ব্রিটেন ও আমেরিকার মতো দেশগুলোয় তেমনটিই দেখা গেছে। বিংশ শতকে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান কমেনি, বরং বেড়েছে। ২০২৪ সালে ম্যাককিনজি কোম্পানির এক জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বলেছে আগামী তিন বছরে তাদের নিয়োগ কমবে। যেসব কোম্পানি রোবটের ব্যবহার বাড়াচ্ছে (যেমন আমাজন), তারা সঙ্গে সঙ্গে কর্মীও নিয়োগ করছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন (CITRINI, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬) একটি ভয়াবহ চিত্র উপস্থাপন করে বলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৮ সালে বেকারত্ব ১০ দশমিক ২ শতাংশে উঠে যেতে পারে (এখন ৪ শতাংশ)।
আসলে শ্রমবাজারে কী ঘটে? এক ধরনের প্রযুক্তি মানুষের শ্রমের বিকল্প হিসেবে কাজ করে; আবার এমন প্রযুক্তি আছে, যারা শ্রমের পরিপূরক বা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করে। যেকোনো সময় এ দুই ধরনের প্রযুক্তিই ব্যবহৃত হতে পারে। আর কর্মসংস্থানে তার চূড়ান্ত ফল কী হবে, তা নির্ভর করবে এ দুই শক্তির কোনটি বেশি প্রভাবশালী তার ওপর।
উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বাড়ে, উৎপাদনের খরচ কমে এবং এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যের দাম কমে। আর কম দামে জিনিস পাওয়া গেলে চাহিদা বাড়তে পারে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কথাই ধরুন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ব্যবহারের তালিকায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন পণ্য ও সেবা; আর তাদের উৎপাদনের এবং রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থান।
২০৫০ সালে বাংলাদেশে প্রযুক্তি ব্যবহারের চিত্র?
এই প্রশ্নের জবাব দিতে হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে কয়েকটি কথা মনে রাখতে হবে। প্রথমত, অর্থনীতির খাতওয়ারি বিন্যাস থেকে দেখা যায় যে, কৃষির অনুপাত কমে যাওয়া আর শিল্পের অনুপাত বাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও তার গতি মন্থর। বিশেষ করে, কর্মসংস্থানে শিল্পের অনুপাত বেড়েছে ধীরগতিতে এবং কয়েক বছরে সেই প্রক্রিয়া হয়েছে বিপরীতমুখী। এ খাতে কর্মসংস্থানের অংশ এবং সংখ্যা দুই-ই কমেছে। দ্বিতীয়ত, মোট উৎপাদনের একটা বড় অংশ আসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের উদ্যোগ থেকে। তৃতীয়ত, মোট কর্মসংস্থানের একটা বিশাল অংশ (প্রায় ৮৫ শতাংশ) নিয়োজিত রয়েছে অনানুষ্ঠানিক খাতে এবং অনেক বছর ধরে এ অবস্থার বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। চতুর্থত, প্রতি বছর যে সংখ্যায় মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, সে পরিমাণ কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। ফলে বিশালসংখ্যক মানুষকে কর্মসংস্থানের জন্য নির্ভর করতে হয় বিদেশের শ্রমবাজারের ওপর।
ওপরে যে অবস্থা বর্ণনা করা হলো, তাতে কী ধরনের এবং কতটা পরিবর্তন ঘটতে পারে আগামী দুই বা আড়াই দশকে? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়া দুষ্কর হলেও দু-তিন দশকের গতিধারা থেকে কিছুটা ধারণা করা যেতে পারে। আর সেটি করলে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই যে, আগামী আড়াই দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে শ্রমিকের বিশাল সংকট দেখা দেবে, যার ফলে অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার প্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে।
তবে এও বলতে হয় যে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং তার আওতা ও গতি কখনো কখনো বাড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শিল্প খাতে, বিশেষ করে বৃহদায়তন শিল্পে এবং আর্থিক ও সেবা খাতে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। সাধারণভাবে মনে হতে পারে যে এই প্রবণতা বেশি হবে রপ্তানিমুখী শিল্পে, কারণ সেখানে দক্ষতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতার প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ; আর তার জন্য প্রয়োজন হবে আধুনিক এআইভিত্তিক প্রযুক্তি। কিন্তু এ কথাও মনে রাখতে হবে, বৈদেশিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধার মূল ভিত্তি সাশ্রয়ী মজুরিতে শ্রম। যতদিন পর্যন্ত প্রকৃত মজুরি বেশি না বাড়িয়ে শ্রমিক নিয়োগ সম্ভব হবে, ততদিন এই সুবিধা বজায় থাকবে এবং স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির প্রযুক্তির যৌক্তিকতা কম হবে। তবে কেউ কেউ, বিশেষ করে বড় আকারের উদ্যোক্তারা এ ধরনের প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকতেই পারেন।
আরও যেসব খাতে এইআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতে পারে, তাদের মধ্যে আছে তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক সেবা, প্রশাসন এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ। এই খাতগুলোয় নিয়োজিত আছে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ১০ শতাংশ। ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে রয়েছে ১৩ শতাংশের মতো, যার একটি ক্ষুদ্র অংশে হয়তো এআই ব্যবহৃত হতে পারে। এই খাতগুলোয় এআইয়ের ব্যবহারের ফলে কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তেই পারে।
কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোয় সম্ভাব্য পরিবর্তন আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমাবদ্ধতাগুলো বিবেচনায় নিলে মনে হয় না যে আগামী দু-তিন দশকে এমন পরিবর্তন ঘটে যাবে, যা আজ কল্পনাতীত। কোনো কোনো চাকরি যেমন থাকবে না, তেমনি আবার নতুন কাজও সৃষ্টি হবে। এই প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবেই কেউ হারবে আর কেউ লাভবান হবে।
নতুন সৃষ্টি হওয়া চাকরিগুলোয় সাধারণভাবে প্রয়োজন হবে উচ্চতর বিশেষায়িত শিক্ষা ও দক্ষতা। চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যারা শিক্ষিত হতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন, তারাই সক্ষম হবেন এই পরিবর্তনের মুখে টিকে থাকতে। মোটা দাগে বললে প্রয়োজন বেশি হবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (STEM) শিক্ষার। নতুন প্রজন্মকে স্কুল থেকেই এ ধরনের বিষয়ে আগ্রহী ও যোগ্য করে তুলতে হবে এবং তাদের জন্য বাড়াতে হবে সুযোগ। আর যদি একটা বিশাল সংখ্যায় ছেলেমেয়েরা এ ধরনের শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তবে অনেকেই বৈশ্বিক বাজারেও কাজ পেতে পারবে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে একটি বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এমপ্লয়মেন্ট সেক্টরের প্রাক্তন বিশেষ উপদেষ্টা





