সান মারিনো পারলে আমরা কেন পারব না

২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে বাংলাদেশ। ছবি: সংগৃহীত
সান মারিনোর মতো ছোট্ট একটা দেশ অলিম্পিকে পদক জিতে নিলেও বাংলাদেশ প্রতি বছর শূন্য হাতেই ফিরে আসে। অন্যসব মাঝারি ও ছোট আসরেও উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন নেই আমাদের। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে সম্মানজনক অবস্থানে যেতে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে
কান্নাভেজা ছলছল চোখের সেই মেয়েটির কথা কি আপনাদের মনে আছে? ২০২১ সালের টোকিও অলিম্পিক গেমসে মেয়েদের শুটিং ট্র্যাপে ব্রোঞ্জপদক জয়ের পর নিজের আবেগ দমন করতে পারেননি। দুচোখ বেয়ে উপচে পড়তে থাকে অশ্রু।
পেরেল্লির কৃতিত্ব কতটা গৌরবের, সেটা আর কেউ না পারুক, আমরা গভীরভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারি। কারণ, চার বছর পরপর অলিম্পিক গেমসের জমকালো উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমাদের দেশটি সম্পর্কে যখন নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলা হয়, With a population of over 170 million, Bangladesh is the most populous country in the world that has never won an Olympic medal.
ব্যর্থতা নিয়ে এভাবে ‘হাটে হাঁড়ি ভাঙা’ কতটা মর্মপীড়াদায়ক হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশের পক্ষে প্রথম পদক জয় করে পেরেল্লির গর্বিত হওয়া তাই খুবই স্বাভাবিক। তার কারণে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে তার দেশ। অলিম্পিকের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে পদক জয় করে ইতালির ভূখণ্ডবেষ্টিত মাত্র ৬১ বর্গমিটার আয়তন আর ৩৪ হাজার জনসংখ্যার সান মারিনো।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ দূরে থাক, বিশ্বব্যাপী সমাদৃত বড় কোনো ক্রীড়া আসরে বাংলাদেশের কি কোনো অবস্থান আছে? বিশ্বের সবচেয়ে দর্শকপ্রিয় খেলা ফুটবলে বাংলাদেশ ফিফা র্যাকিংয়ে ১১০ থেকে নামতে নামতে এখন ১৮১ নম্বরে। এ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটি তার কৌলীন্যও হারিয়ে ফেলেছে।
১৯৮৬ সালে সিউল এশিয়ান গেমসে বক্সার মোশারফ হোসেনের সুবাদে একটা ব্রোঞ্জপদক জুটলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে আর কোনো সাফল্য আসেনি। যে খেলাটি বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, সেই কাবাডি এশিয়ান গেমসে ১৯৯০ সালে অন্তর্ভুক্ত হলে শুরুতে রৌপ্যপদক পাওয়া গেলেও এখন কিছুই মিলছে না। পুরুষ দল তিনটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জ এবং নারী দল দুটি ব্রোঞ্জপদক জিতেছে। কাবাডিতে পদক পাওয়ার মাধ্যমে সম্মান রক্ষা হলেও হালে নিজেদের এ খেলায় অনেকটাই বহিরাগত হয়ে থাকতে হচ্ছে। এশিয়ান গেমসে গুরুত্বহীন খেলাগুলোর একটি ক্রিকেট। অলিম্পিক গেমসের যে মূলমন্ত্র ‘সিটিয়াস, অলটিয়াস, ফরটিয়াস’, তার সঙ্গে ক্রিকেট খাপ খায় না।
এ কারণে প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়ায় ক্রিকেটকে সেভাবে পাত্তা দেওয়া হয় না। ২০১০ সালের এশিয়ান গেমসে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ভারতের অনুপস্থিতিতে যে দলগুলো অংশ নেয়, তারা পূর্ণাঙ্গ শক্তির ছিল না। এমনকি বাংলাদেশও দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে স্বর্ণপদক জয় করে। এশিয়ান গেমসে এটিই বাংলাদেশের একমাত্র স্বর্ণপদক। সেবার নারী দল জয় করে রৌপ্যপদক। এরপর পুরুষ দল দুটি ও নারী দল একটি ব্রোঞ্জপদক পায়। এখন তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।
আমাদের ক্রীড়াঙ্গন চলছে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে। কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেই। কোনো দিকনির্দেশনা ছাড়াই বৃদ্ধি করছি খেলার সংখ্যা
কমনওয়েলথ গেমসে ১৯৯০ সালে শুটিংয়ে একটি স্বর্ণ ও একটি ব্রোঞ্জপদক জিতে চমক দেখায় বাংলাদেশ। সেই ধারাবাহিকতায় শুটাররা অনিয়মিতভাবে আরও একটি স্বর্ণ, চারটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ জয় করে। সর্বশেষ গেমস থেকে ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে। ১৯৮৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার হন নিয়াজ মোর্শেদ। এরপর আরও চারজন অর্জন করেছেন দাবাড়ুদের সর্বোচ্চ এ খেতাব, কিন্তু ২০০৮ সালের পর আর কেউ গ্র্যান্ডমাস্টার হতে পারেননি। অথচ নিয়াজের পর ১৯৮৮ সালে বিশ্বনাথন আনন্দ ভারতের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পর এখন তাদের সংখ্যা ৯১। আনন্দের পর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন গুকেজ ডোম্মারাজু। স্থবির হয়ে আছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের প্রথম গলফার হিসেবে সিদ্দিকুর রহমান ২০১০ সালে জয় করেছেন ‘এশিয়ান ট্যুর’ শিরোপা। ব্রিটিশ নারী দাবায় একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হন রানী হামিদ। রোমান সানা ২০১৯ সালে বিশ্ব আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে পুরুষ এককে ব্রোঞ্জপদক এবং দিয়া সিদ্দিকীকে নিয়ে ২০২১ সালে আরচারি বিশ্বকাপে রিকার্ভ মিশ্র দল বিভাগে জয় করেন রৌপ্যপদক। এরকম কিছু সাফল্য নিয়ে আমরা গর্ব করলেও বৃহত্তর পরিসরে তার খুব একটা গুরুত্ব নেই। আমাদের ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা দক্ষিণ এশীয় গেমসকে (এসএ গেমস) কেন্দ্র করে, যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে তেমন সমাদৃত নয়। তারপরও অনিয়মিত এ গেমসে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য ১৩ আসরে দুবার তৃতীয় হওয়া। গড়পড়তা পঞ্চম স্থানটাই স্থায়ী হয়ে আছে। এই হলো বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সার্বিক চিত্র।
আমাদের ক্রীড়াঙ্গন চলছে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে। কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেই। কোনো দিকনির্দেশনা ছাড়াই বৃদ্ধি করছি খেলার সংখ্যা। অর্থনৈতিকভাবে আমাদের সামর্থ্য সীমিত, অথচ আমরা ৫৪টি ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনকে সমানভাবে পরিচালিত করতে চাচ্ছি। এ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কতদূর পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব?
তবুও আশাবাদী হতে চায় মন। সময় তো আর একইরকম বয়ে যায় না। আগামীতে নিশ্চয়ই দেখতে পাওয়া যাবে, কেউ না কেউ অলিম্পিক গেমসে পদক জয়ের স্বপ্ন নিয়ে ঢেলে সাজিয়েছেন ক্রীড়াঙ্গনকে। টার্গেট করা হয়েছে সম্ভাবনাময় কয়েকটি খেলা। পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখেছেন, দলীয় খেলায় বড় সাফল্য পাওয়া নিকট ভবিষ্যতে সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে আরচারি, শুটিং, দাবার মতো ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের সম্ভাবনা থাকা খেলাগুলোকে প্রাথমিকভাবে সবরকম সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত কঠোর অনুশীলন, মানসিক দৃঢ়তা, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন ও ডায়েট, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কোচের পরামর্শ অনুসরণ, সঠিক পরিবেশ, লক্ষ্য নির্ধারণসহ রুটিন বিষয়গুলো প্রতিটি ক্রীড়াবিদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুক্ত করা হয় নতুন নতুন প্রযুক্তি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাটা মস্ত এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া হয়। দৃষ্টি রাখা হয় সুদূরে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), বায়োমেট্রিকসের মতো প্রযুক্তি ক্রীড়াঙ্গনে সংযুক্ত করা হয়। খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের রিয়াল টাইম ডেটা বিশ্লেষণ, ফিটনেস মনিটরিং, জিপিএস ট্র্যাকার ব্যবহার, ইনজুরি প্রতিরোধের জন্য এআইচালিত কোচিং সিস্টেমসহ উন্নতমানের টেকনোলজি দিয়ে ক্রীড়াবিদদের প্রস্তুত করা হচ্ছে।
উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় পর্যায়ে গড়ে তোলা আধুনিক স্টেডিয়াম বছরভর সরগরম থাকছে ক্রীড়াবিদদের পদচারণায়। ঢাকার অদূরে গড়ে ওঠা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসংবলিত স্মার্ট ক্রীড়া কমপ্লেক্সে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদক জয়ের আশায় ঘাম ঝরানো অনুশীলনরত দেশসেরা ক্রীড়াবিদরা। পর্যায়ক্রমে পাওয়া যাচ্ছে এর সুফল। দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের পর এশিয়ান গেমসে পদক জয়ের সামনের সারিতে থাকছে বাংলাদেশ। লক্ষ্য, ২০৪৮ সালের অলিম্পিক গেমসে স্বপ্নপূরণ। স্বাধীনতার শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে নয়াদিল্লিতে অলিম্পিক আয়োজন করেছে ভারত। বাংলাদেশের জন্য সেটিও হয়ে ওঠে চমৎকার একটি সুযোগ। নবনির্মিত কোনো স্মার্ট আরচারি কিংবা শুটিং কমপ্লেক্সে বাজিমাত করেছেন বাংলাদেশের কোনো আরচার বা শুটার। ঘোষণা করা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশের একজন এই প্রথম নিজের দেশের পক্ষে পদক জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন। বিজয়ীর দুই চোখ বেয়ে অনর্গল ধারায় বইছে আবেগ আর আনন্দের অশ্রু। তা দেখে ২৪ কোটি মানুষের (ততদিনে জনসংখ্যা এমন হতে পারে) বুকে চেপে থাকা দীর্ঘশ্বাস নিমেষেই দূর হয়ে যায়। সেই সঙ্গে সরকার ঘোষিত ছুটির দিনটি হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। বিজয়ী খেলোয়াড়ের কোচ জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে দৃপ্তকণ্ঠে বললেন, ২০২১ সালের টোকিও অলিম্পিক গেমসে সবচেয়ে ছোট দেশ সান মারিনোর শুটার আলেসান্দ্রা পেরেল্লির পদক জয়ের দৃশ্যপটটি আমার বুকের মধ্যে গভীর কষ্ট হয়ে থেকে যায়। সেদিন আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, একটা ছোট দেশ যদি পারে, আমরা কেন পারব না? বাংলাদেশের হয়ে অবশ্যই একদিন অলিম্পিক গেমসে পদক জয় করব; ঘোচাব দেশের বদনাম। খেলোয়াড় হিসেবে না পারলেও আজ কোচ হিসেবে সেটি পেরেছি। পূরণ হয়েছে আমাদের সবার স্বপ্ন। হতে পারে এটি কল্পনা, কিন্তু এমনটা কি সত্যি হতে পারে না?
লেখক: ক্রীড়া সাংবাদিক ও ক্রীড়া লেখক সমিতির সাবেক সভাপতি





