৭ দ্রষ্টা
কুদরাত-এ-খুদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান শিক্ষা কমিশন

ড. মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা (১ ডিসেম্বর ১৯০০ – ৩ নভেম্বর ১৯৭৭)
জাতি গঠনের ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যারা একসঙ্গে জ্ঞান, চিন্তা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্মাণ করেন। ড. মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা ছিলেন তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন রসায়নবিদ নন; ছিলেন শিক্ষাবিদ ও চিন্তক।
১৯০০ সালের ১ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার মাড়গ্রামে তার জন্ম। শৈশবেই মেধার স্বাক্ষর রেখে প্রথাগত ধর্মীয় শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক শিক্ষায় এগিয়ে আসেন। কলকাতা মাদ্রাসা থেকে ম্যাট্রিক এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়নে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা তাকে নিয়ে যায় লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ডিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল এক বিরল কৃতিত্ব, বিশেষ করে উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের জন্য।
দেশে ফিরে কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতা দিয়ে। কিন্তু কাজের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয় শিক্ষা প্রশাসন ও গবেষণায়। প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তানের জনশিক্ষা পরিচালক, বিজ্ঞান উপদেষ্টা এবং পরে বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারের পরিচালক, প্রতিটি পদেই তিনি রেখে গেছেন দূরদর্শিতার ছাপ। শূন্য থেকে গবেষণাগার গড়ে তোলার মতো কঠিন কাজ তিনি করেছেন নিষ্ঠা ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে।
বিজ্ঞানচর্চায় তার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের নিজস্ব সম্পদকে কাজে লাগানো। পাটকাঠি থেকে কাগজ ও পারটেক্স উৎপাদন, আখের রস থেকে ভিনেগার, কিংবা সমুদ্রের পানি থেকে বিভিন্ন মূল্যবান রাসায়নিক আহরণের ধারণা— এসব উদ্যোগ তার চিন্তার বাস্তবমুখী দিককে স্পষ্ট করে। কুদরাত-এ-খুদার গবেষণা শুধু ল্যাবরেটরির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা শিল্প, অর্থনীতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান নিঃসন্দেহে শিক্ষা কমিশন। ১৯৭২ সালে তার নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদনে তিনি যে শিক্ষানীতির রূপরেখা দেন, তা ছিল একটি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও গণমুখী রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নচিত্র। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসার এবং বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া— এসব প্রস্তাব আজও প্রাসঙ্গিক।
এই প্রতিবেদনে তিনি শিক্ষাকে বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী করার ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষভাবে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষার বিস্তার, প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীনতা, নারীশিক্ষার উন্নয়ন এবং স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চাকে সহজ ও জনপ্রিয় করতে কুদরাত-এ-খুদার চেষ্টা ছিল অনন্য। কঠিন বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি লিখেছেন বেশ কয়েকটি বই।
১৯৭৭ সালের ৩ নভেম্বর পৃথিবী ছেড়ে চিরবিদায় নেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া চিন্তা, প্রতিষ্ঠান এবং স্বপ্ন আজও আমাদের পথ দেখায়।




