নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া রাষ্ট্র হবে অচল গাড়ি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সন্তান লালন-পালনের মাধ্যমে সমাজ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি স্থাপন করেন নারী। পোশাকশিল্প থেকে উদ্যোক্তা, করপোরেট খাত এবং কৃষি— সর্বত্র নারীর সরব উপস্থিতিও জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনো নারীর অংশগ্রহণ ভারসাম্যপূর্ণ হয়নি
রাজনীতি একটি দেশ পরিচালনার নীতি নির্ধারণ করে। আর সংসদ জনগণের নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করে। আমাদের দেশের জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী হলেও সংসদের দিকে তাকালে আমরা দেখি ৩০০ সংসদ সদস্যের মধ্যে নির্বাচিত নারী সদস্য মাত্র সাতজন। এই প্রকট শূন্যতা নারী নেতৃত্বের অনুপস্থিতি শুধু প্রমাণ করে না, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতায়নে আমাদের দৈন্যদশাই ফুটিয়ে তোলে। এই সংসদে দুটি ধর্মীয় মৌলবাদী দল রয়েছে, যারা নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি এবং এই দলের একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য ওয়াজ মাহফিলে অন্য নারী সংসদ সদস্যদের ব্যাপারে অশ্লীল কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে চলেছেন। সংসদের মতো জায়গায় যদি নারীদের সম্পর্কে এমন মন্তব্য করা যায়, তাহলে সারা দেশে নারীদের কি পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাজপথে নারীদের উপস্থিতি ছিল অর্ধেকের বেশি। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর মৌলবাদী শক্তির উত্থান ও নারীবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড সমানতালে বেড়েছে এবং নারী নির্যাতনের মাত্রাও বেড়েছে। নির্বাচিত সরকারের আমলে শুধু এপ্রিল মাসেই প্রায় ৩০০ নারী শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের ঘটনায় আমরা বিশ্বে চতুর্থ। আমাদের গণপরিবহনে ৯৪ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হন। বাল্যবিয়ের মধ্যে এশিয়ায় প্রথম হওয়ার পরও আমরা বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের পক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে যুক্তি করতে দেখি। বাংলাদেশে সম্পত্তির মধ্যে মাত্র চার ভাগের মালিক নারী এবং এই মালিকানা ও অনেকাংশেই দেখা যাবে যে, কর ফাঁকি দেওয়া বা সম্পদ লুকানোর উদ্দেশ্যে স্ত্রীর নামে মালিকানা করার ঘটনাই বেশি।
আইনে যদি নারীর প্রতি বৈষম্য থাকে, তাহলে পরিবার-সমাজে তার ছাপ থাকবে— এটিই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের পারিবারিক আইনগুলোতে নারীকে সম্পত্তিতে সমান অধিকার দেওয়া হয়নি। অর্থনৈতিকভাবে নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলার পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। আজকে কর্মজীবী মায়েদের জন্য অনেক বিভাগীয় শহরেও একটি ডে কেয়ার সেন্টার নেই, কর্মজীবী নারী হোস্টেল নেই, নারীদের জন্য একটা পাবলিক টয়লেট পর্যন্ত নেই।
নারীদের নিরাপত্তাও সমাজ নিশ্চিত করতে পারে না। নারী নির্যাতনকারীরা রাজনৈতিক প্রশ্রয় পায়, ক্ষমতার আশ্রয় পায় এবং অধিকাংশ নারী নির্যাতনের বিচার হয় না। এবার হামের টিকার অভাবে ৩০০-এর বেশি শিশু এরই মধ্যে মারা গেছে। টিকার সংকটের সঙ্গে সঙ্গে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের শিশুদের চিকিৎসার চিত্র। মা ও শিশু হাসপাতালগুলো কার্যকর থাকলে ভয়াবহতা অনেকটাই কমে আসত। এ বিষয়ে কোনো আলোচনা বা উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।
আমাদের দেশের জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী হলেও সংসদের দিকে তাকালে আমরা দেখি ৩০০ সংসদ সদস্যের মধ্যে নির্বাচিত নারী সদস্য মাত্র সাতজন। এই প্রকট শূন্যতা নারী নেতৃত্বের অনুপস্থিতি শুধু প্রমাণ করে না, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতায়নে আমাদের দৈন্যদশাই ফুটিয়ে তোলে
পরিবার পরিচালনায় গৃহস্থালি কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজের ৮৫ ভাগ করেন নারীরা। সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, গৃহে একজন নারী দিনে প্রায় ৪৫ ধরনের কাজ করেন। কিন্তু এ কাজের কোনো স্বীকৃতি-মর্যাদা পরিবার এবং রাষ্ট্রে নেই। সে কারণেই পরিবারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গৃহিণী নারীদের অংশগ্রহণ তার স্বামী বা পরিবারের অন্য সদস্যরা খুব একটা গ্রহণ করেন না। অর্থাৎ সংসারে নারীদের দায়িত্ব যত আছে, অধিকার সে পরিমাণে নেই। বিশ্বের অনেক দেশেই বিবাহবিচ্ছেদের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমান সম্পত্তি ভাগ করার আইন আছে। অর্থাৎ যদি ২০ বছর সংসার করার পর কোনো স্বামী-স্ত্রীর বিবাহবিচ্ছেদ হয়, তাহলে এই ২০ বছরে সৃষ্ট মোট সম্পত্তি সমান সমান ভাগ হবে। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা হলো, সংসার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নারীর শারীরিক-মানসিক শ্রম থাকা সত্ত্বেও তারা স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর সম্পত্তির প্রায় কোনো অংশই পান না। ফলে গৃহিণীরা অসহায় হয়ে পড়েন। অথচ বিয়ের পর ওই সংসারের যা কিছু সম্পদ-সম্পত্তি অর্জিত হয়েছে, গৃহিণী নারীরও সেখানে পরিপূরক ভূমিকা আছে। গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য নিরূপণ ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থাকলে পরিবার এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন হতো। পারিবারিক নির্যাতনও কমত।
নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক দৃষ্টিভঙ্গির খুবই নগ্ন প্রকাশ আমরা দেখেছিলাম নারী সংস্কার কমিশনের বিষয়ে। অন্যান্য সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে সাধারণ আলাপ-আলোচনা হলেও নারী সংস্কার কমিশনকে হেয় করার জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করা হয়েছিল। নারীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কথা বলার জন্য দু-একটি বামপন্থী দল ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে তখন খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রগতিশীল বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া নারীর অধিকার আদায় সম্ভব নয়। মৌলবাদীরা নারীকে ঘরের আসবাবপত্র বানিয়ে গৃহবন্দি করতে চায় আর পুঁজিবাদীরা নারীকে ভোগ্যপণ্য বানিয়ে বিক্রি করতে চায়। পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে সমাজে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা, তা দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর শ্রমের অবদানের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।
মানুষ হিসেবে নারীর যে সামাজিক অবস্থান তৈরির লড়াই, সে লড়াই একমাত্র প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীরাই করছেন এবং সে লড়াই শক্তিশালী হলেই রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের যে স্বপ্ন আমরা দেখি, সে স্বপ্নপূরণ সম্ভব। কাজী নজরুল ইসলাম বলে গিয়েছিলেন— ‘কোন কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারি,/ প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়-লক্ষ্মী নারী।’ নারীমুক্তি ছাড়া সভ্যতার মুক্তি সম্ভব নয়। অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারে রেখে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বেগম রোকেয়া বলে গিয়েছিলেন— ‘যে গাড়ির এক চাকা বড় এবং এক চাকা ছোট হয়, সে গাড়ি অধিক দূরে অগ্রসর হইতে পারে না; সে কেবল একই স্থানে (গৃহকোণেই) ঘুরিতে থাকিবে।’ আমাদের রাষ্ট্র যেন সে রকম একটি অচল গাড়িতে পরিণত না হয়, সেজন্য নারীর অধিকারের পক্ষে সরব হওয়া সময়ের দাবি।
লেখক: রাজনীতিবিদ





