৭ স্থপতি
রাজনীতিকে কৃষকের দোরগোড়ায় নিয়ে যান ফজলুল হক

শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক (২৬ অক্টোবর ১৮৭৩ – ২৭ এপ্রিল ১৯৬২)
শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবনের বড় কাজগুলো হলো– ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন, বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধনী, ১৯৩৮ পাস করানো ও কৃষক-প্রজা পার্টি গঠন। লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে অবিভক্ত ভারতের মুসলিম জনমানসে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন দানা বাঁধে, প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধনীর ফলে কৃষকদের ওপর জমিদারদের লাগামহীন অত্যাচার চিরদিনের জন্য বন্ধ হয় এবং কৃষক-প্রজা পার্টি গঠনের মাধ্যমে রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যান তিনি।
মুসলিম লীগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৪০ সালে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর সভাপতিত্বে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে জ্বালাময়ী বক্তৃতায় প্রথম পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করেন আবুল কাশেম ফজলুল হক। তার বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে পাঞ্জাববাসী তাকে ‘শের-ই-বঙ্গাল’ উপাধি দেয়। সেই থেকে তিনি শেরেবাংলা হিসেবেই সমধিক পরিচিত। বিশেষ করে বাংলার কৃষকসমাজ এ নামেই তাকে ডাকতে ভালোবাসত, কখনোবা ডাকত হক সাহেব।
রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময়ে নানা ভূমিকায় থাকলেও ফজলুল হকের ভাবনা-চিন্তা আবর্তিত হতো বাংলার কৃষকসমাজ ঘিরে। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, এ দেশের দরিদ্র কৃষকদের অবস্থার উন্নতি না হলে দেশে কখনো অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না।
মুসলিম লীগ গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ফজলুল হকের রাজনৈতিক পথচলা শুরু। ১৯১৩ সালে বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগের সম্পাদক হন তিনি। একই বছর ঢাকা বিভাগ থেকে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে নির্বাচিত হন।
১৯১৬ সালে হক সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে লখনৌ চুক্তি প্রণয়নে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন হক সাহেব। এ চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল ভারতীয় স্বশাসনের দাবিতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।
ফজলুল হকের ভাবনা-চিন্তার কেন্দ্রে ছিল বাংলার কৃষকসমাজ। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, দরিদ্র কৃষকদের অবস্থার উন্নতি না হলে দেশে অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না
মুসলিম লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ফজলুল হক ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের যুগ্ম সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করছিলেন। এরপর এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯১৮ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একই সঙ্গে মুসলিম লীগের সভাপতি এবং কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৮ সালে সভাপতিত্ব করেন সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের দিল্লি অধিবেশনে। ১৯১৯ সালে অমৃতসর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কর্তৃক গঠিত পাঞ্জাব তদন্ত কমিটিতে তিনি মতিলাল নেহরু, চিত্তরঞ্জন দাস এবং অন্যান্য বিশিষ্ট নেতার সঙ্গে সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।
১৯২৯ সালে ফজলুল হক ‘অল বেঙ্গল টেন্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করে পরে ১৯৩৭ সালে এটিকে রূপান্তর করেন কৃষক-প্রজা পার্টিতে। একই বছর ভারতীয় প্রাদেশিক নির্বাচনে তার দল বাংলার বিধানসভায় ৩৫টি আসন লাভ করে। এটি ছিল বেঙ্গল কংগ্রেস ও বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগের পর তৃতীয় বৃহত্তম দল। ফজলুল হক বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগ এবং স্বতন্ত্র বিধায়কদের সঙ্গে একটি জোট গঠন করেন। বিধানসভার নেতা এবং বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর ফজলুল হক তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পক্ষে তিনি অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করলে মুখ্যমন্ত্রী হন। মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের কবর রচনা করেন। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, আইনপ্রণেতা ও রাষ্ট্রনায়ক ঢাকায় মারা যান। ঢাকা হাইকোর্টের পশ্চিম পাশে তিন নেতার কবরের একটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি।




