‘ঢাকার পেট থেকে’ বাংলাদেশকে বের করতে হবে

বাংলাদেশে অন্য সবকিছুর মতো স্বাস্থ্য খাতেও যা কিছু মানসম্পন্ন, উন্নত এবং নির্ভরযোগ্য তার প্রায় সবই ঢাকায় মেলে। কিন্তু দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যচিত্র বদলাতে হলে স্বাস্থ্যসেবা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। একটি কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে চিকিৎসাকে সবার কাছে সহজলভ্য করলেই রোগীদের মুক্তি
একজন বিদেশি সাংবাদিক বাংলাদেশে এসে গোটা দেশ ঘুরে দেখেন। রাজধানী ঢাকায় ফিরে তিনি অতি সংক্ষিপ্ত কিন্তু খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেন। বলেন, ‘পুরো বাংলাদেশটি ঢাকায় ঢুকে গিয়েছে।’ বাংলাদেশের যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রায় সবকিছুই ঢাকায় অবস্থিত। এ ‘সবকিছু’র মধ্যে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কোনো এক গ্রামের সহজ আলী, পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার এক গ্রামবাসী অথবা পটুয়াখালীর বাউফলের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের একজন বাসিন্দা— এদের যে কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘ভালো চিকিৎসা পাওয়ার জন্য আপনাকে বাংলাদেশের কোথায় যেতে হবে?’ তাদের সবার উত্তর কিন্তু হবে একটাই। সন্দেহাতীতভাবে সেটি ‘ঢাকা শহর’। ঢাকার বাইরে দেশের অধিকাংশ স্থান জুড়ে চলছে জোড়াতালির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা।
অবকাঠামোগত দিক দিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো দেশের চেয়ে রয়েছে এগিয়ে। এ দেশের গ্রামাঞ্চলে প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। দেশে কমবেশি রয়েছে চৌদ্দ হাজারের মতো কমিউনিটি ক্লিনিক। অনেক ইউনিয়নে মেডিকেল সাব-সেন্টার আছে। প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য প্রকল্প বা উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স এবং প্রতিটি জেলা পর্যায়ে আছে জেলা সদর হাসপাতাল। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ১১০টির মতো। প্রতিটি মেডিকেল কলেজের সঙ্গে রয়েছে একটি করে হাসপাতাল। এ ছাড়া বিষয়ভিত্তিক বিশেষায়িত হাসপাতাল যেমন চক্ষু, শিশু, হার্ট, বক্ষব্যাধি, সংক্রামক ব্যাধি, হাড় ও জোড়া, কিডনি, মানসিক রোগ, ক্যানসার ইত্যাদি হাসপাতাল বাংলাদেশে আছে। বাংলাদেশে মেডিকেল ইউনিভার্সিটি রয়েছে বেশ কয়েকটি।
শুধু অবকাঠামো তৈরি হয় না। স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তির। স্বাস্থ্যসেবা মূলত একটি দলীয় কাজ। সাধারণত ২৩ জন সদস্য নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা টিম গঠন করা হয়। প্রাথমিক টিমের সদস্য থাকে নয়জন। এতে একজন ডাক্তারের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন টেকনোলজিস্ট বা টেকনিশিয়ান থাকেন। এ অনুপাতটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সব ধরনের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেশেই গ্রহণ করতে হবে। তারা নিজ নিজ চাকরিস্থল ও নির্বাচনী এলাকায় থেকে স্বাস্থ্যসেবা নেবেন
বাংলাদেশে মেডিকেল ডাক্তারের সংখ্যা সর্বোচ্চ নব্বই হাজারের মতো হবে। আঠারো কোটি মানুষের জন্য সংখ্যাটি বড়ই অপর্যাপ্ত। নব্বই হাজার ডাক্তারের বিপরীতে দেশে নার্সের সংখ্যা দুই লাখ সত্তর হাজার থাকার কথা। বাস্তবে আছে ষাট হাজারের মতো। একইভাবে যেখানে চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টেকনিশিয়ানের দরকার, রয়েছে বিশ হাজারের কম। দেশের মানুষের চিকিৎসায় প্রতিটি বিষয়ে কতজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দরকার এবং কতদিনের মধ্যে তাদের তৈরি করা যাবে তার কোনো পরিকল্পনা কখনো তৈরি হয়নি। ফলে স্বাস্থ্যসেবা এ দেশে চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
যেকোনো দেশের স্বাস্থ্যসেবার আদর্শ রূপ হচ্ছে ‘পিরামিড মডেল’। পিরামিডের ভিত্তি এবং নিচটা হয় বিস্তৃত। এরপর ওপরের দিকে যেতে থাকলে পিরামিডের বিস্তৃতি ক্রমেই কমতে থাকে। তারপর একেবারে শীর্ষ বা মাথায় গিয়ে পিরামিড একটিমাত্র সরু অগ্রভাগে শেষ হয়। আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবার নিচের অংশে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন সাব-সেন্টার ও উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স। স্বাস্থ্যসেবার এ স্তরকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা প্রাইমারি হেলথ কেয়ার বলা হয়। জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমিক স্তর। বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল নিয়ে স্বাস্থ্যসেবার তৃতীয় স্তর গঠিত হয়। দক্ষ জনবলের কমতি থাকার জন্য সর্বস্তরের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জনবলের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি তৃতীয় স্তর থেকে যত নিচের দিকে যাওয়া যায়, তত বাড়তে থাকে। বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর প্রায় শতভাগ ঢাকায় অবস্থিত। সেগুলোতেও দক্ষ জনবলের ব্যাপক অভাব। দেশের প্রধান এবং অগ্রগণ্য মেডিকেল কলেজের বেশিরভাগ ঢাকায়। শুধু তাই নয়, যে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘সেন্টার ফর এক্সিলেন্স’ বা সর্বোচ্চমানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালে রূপ দেওয়ার জন্য কাজ চলছে, সেই বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়টিও ঢাকায় অবস্থিত। ফলে অধিকাংশ মানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ঢাকায় অবস্থান করেন। বিপরীতে জেলা বা উপজেলায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার একেবারেই কম।
বাংলাদেশের সব সুবিধা ও ক্ষমতার কেন্দ্রস্থল হলো ঢাকা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নানা সূত্র, সংযোগ ও প্রভাব ব্যবহার করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা ঢাকায় অবস্থান করতে মরিয়া থাকে। রোগ নির্ণয়ের উন্নততর যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম অধিকাংশ ঢাকায় স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের সব ধরনের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা নিজেদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা গড়ে তোলার জন্য ঢাকাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং ভালোমানের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের ঢাকায় রাখায় আগ্রহী। এভাবেই বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার যা কিছু মানসম্পন্ন, উন্নত এবং নির্ভরযোগ্য তার প্রায় সবকিছুই ‘ঢাকায় ঢুকে গিয়েছে’।
এজন্য উপজেলা, জেলা, এমনকি বিভাগীয় শহরেও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে মানুষ ঢাকামুখী হয়। মানুষের এ দুর্ভোগ দূর করা জরুরি। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সব ধরনের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য কী করা যেতে পারে?
মান বজায় রেখে স্বাস্থ্যসেবাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হলে প্রথমে যে কাজটি করতে হবে সেটা হলো— ‘ঢাকার পেট থেকে’ থেকে বাংলাদেশকে বের করে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দেশের অধিকাংশ জেলায় তৃতীয় স্তরের অর্থাৎ উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা জরুরি। এ লক্ষ্যে অনেক বিশেষায়িত হাসপাতাল জেলা সদরে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করতে হবে। জেলা সদর হাসপাতাল এবং জেলায় অবস্থিত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে দক্ষ জনবল, পরীক্ষার যন্ত্রপাতি, সিসিইউসহ আরও আনুষঙ্গিক বিষয়ের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করা খুবই দরকার। অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হবে মাধ্যমিক এবং একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রধান কেন্দ্র।
ইউনিয়ন মেডিকেল সাব-সেন্টার হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। বাংলাদেশে বর্তমান চৌদ্দ হাজারের মতো কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। তাই দ্রুত প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক দেশের সব অঞ্চলে স্থাপন করা প্রয়োজন। কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান ইত্যাদি নির্ধারিত সেবা মানুষকে প্রদান করে। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ইউনিয়ন সাব-সেন্টার, সেখান থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং উপজেলা থেকে জেলা সদর ও জেলায় অবস্থিত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করার জন্য একটি কার্যকর সহজ রেফারেল (সেটা ডিজিটাল রেফারেল হলে ভালো) সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা। এরকম একটি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা গেলে সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবার অপর্যাপ্ততা ও দৈন্যদশা ঘুচবে। এগুলো হচ্ছে পদ্ধতিগত বা মেথোডোলজিক্যাল প্রস্তাব। এসবের বাইরে একটি খাঁটি বাঙালিয়ানা প্রস্তাব পেশ করছি।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, সব ধরনের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সব ধরনের সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেশেই গ্রহণ করতে হবে। তারা নিজ নিজ চাকরিস্থল ও নির্বাচনী এলাকায় থেকে স্বাস্থ্যসেবা নেবেন। বিশেষ রোগের জন্য ভিন্ন স্থান অথবা বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হলে শুধু সরকার কর্তৃক পূর্বগঠিত মেডিকেল বোর্ড সবদিক বিবেচনা করে অনুমতি দিতে পারবে। এরকম একটি আইন করা গেলে কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ঘটবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং পদ্ধতি গড়ে উঠবে।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ





