রবীন্দ্রসংগীত চর্চার অভিভাবক ছিলেন ওয়াহিদুল হক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি জাতির আত্মার সন্ধান মেলে তার সংস্কৃতিতে, আর সেই আত্মাকে জাগিয়ে রাখার নেপথ্যে যারা ছিলেন তাদের অন্যতম ওয়াহিদুল হক। ১৯৩৩ সালের ১৬ মার্চে কেরানীগঞ্জের ভাওয়াল মনোহারীয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া মানুষটির ভেতর বাস করতেন একাধিক পরিপূর্ণ সত্তা: সাংবাদিক, লেখক আর সবচেয়ে বড় পরিচয়, এক অক্লান্ত সংগীতসংগঠক।
ওয়াহিদুল হকের কর্মজীবনের সূচনা হয় ১৯৫৬ সালে, দ্য ডেইলি মর্নিং নিউজ পত্রিকায় সাংবাদিকতার মাধ্যমে। পাঁচ দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি দ্য পিপলস পত্রিকার সম্পাদক এবং ডেইলি স্টার পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রায় এক দশক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন তিনি।
১৯৬১ সালে আইয়ুব সরকারের রবীন্দ্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ছায়ানট।
‘ছায়ানট’-কে তিনি একক নিষ্ঠায় বাঙালি সংস্কৃতির ধ্রুবক বানিয়ে গেছেন
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা শিল্পী সংস্থা গঠন করে তিনি একজন বীরকণ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। তার হাত ধরে জন্ম হয় ‘স্বাধীন বাংলা শিল্পী সংস্থা’-র। সেই দলটি দেশাত্মবোধক গানে সামনের সারির যোদ্ধাদের মনোবল যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি পেছনে থাকা কোটি মানুষের মনে ছড়িয়ে দিয়েছে স্বপ্ন। যুদ্ধ শেষেও তার সাধনা থেমে থাকেনি। সারা দেশে রবীন্দ্রসংগীত পৌঁছে দিতে ১৯৮০ সালে গড়ে তোলেন জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ। শুদ্ধ বাচনিক উৎকর্ষের জন্য তার প্রতিষ্ঠিত আবৃত্তি সংগঠন কণ্ঠশীলন আজও অনন্য। এ ছাড়া তিনি শিশুতীর্থ নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয় এবং আনন্দধ্বনির মতো অসংখ্য সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
‘ছায়ানট’-এর মতো বিশাল সাংস্কৃতিক তরীটিকে তিনি একক নিষ্ঠায় বাঙালি সংস্কৃতির ধ্রুবক বানিয়ে গেছেন। এখনো রবীন্দ্রসংগীতের অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাকে। তিনি চাইতেন না কেবল গান শেখাতে, চাইতেন মানুষ গড়তে, সেই কারণেই তাকে বলা হতো ‘শিল্পী তৈরির কারিগর’। ২০০৭ সালে তিনি বিদায় নিলেও, তার হাতে গড়া সাঙ্গীতিক উত্তরাধিকার আজও বাঙালির ঘরে ঘরে রবীন্দ্রসংগীত, শুদ্ধসংগীত ও লোকগীতির প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে।
তার চিন্তাশীল লেখনীও পাঠকমহলে ছিল সমাদৃত। ‘অভয় বাজে হৃদয় মাঝে’ এবং ‘এখনও গেল না আঁধার’ শীর্ষক কলামগুলো তার প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘চেতনার ধারায় এসো’ এবং ‘গানের ভিতর দিয়ে’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংগীতে তার আজীবনের সাধনা মিশে রয়েছে ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’ নামক রবীন্দ্রসংগীত অ্যালবামে। শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ লাভ করেন। ২০০৮ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।




