আমার হৃদয়ে বাঁচো
কে জানে এখন কোথায় তরঙ্গ তুলছেন ‘মাখনা ভাই’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষের মনের মধ্যে সময় আরও অনেক মানুষকে হুড়মুড় করে প্রবেশ করিয়ে দেয়। মানুষের মনের মধ্যে অসংখ্য দরজা, অসংখ্য ঘর আছে। সেই দরজা দিয়ে কেউ ঢোকে, কেউ আবার বের হয়ে যায়। সেখানে প্রবেশ করে কেউ চুপ করে বসে থাকে। আবার কখনো অনেকের কলস্বরে প্লাবিত হয় মনভূমি। সকলের আসা-যাওয়ার পথের ধারে মন চুপ করে বসে থাকে আর দেখে। কখনো যত্নে কুড়িয়ে নেয় নুড়ি পাথরের মতো স্মৃতিখণ্ড।
প্রয়াত কবি বিষ্ণু দে তার একটি কবিতার বইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘আমার হৃদয়ে বাঁচো’। মনের মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে বইয়ের নামটা ভেসে এলো। খুঁজতে খুঁতে এত দূর এসে মনে হয়, নুড়ি পাথরের মতো কাদের স্মৃতি কুড়িয়ে রাখল এই মন, কারা সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেল? কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, পরিচয়ের জাহাজ ভিড়েছিল জেনে নেয়ার বন্দরে। আবার সেই জাহাজটা ভেসে গেছে দূর সমুদ্রে। এক জীবনে কতজন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের ঘটনা ঘটে? এই সংখ্যা গুনে বের করা অসাধ্য। তবুও মনের মধ্যে সেই একদা কাছের মানুষেরা এসে বসে থাকে। হাত নাড়ে, হাসে, গান গায়। আচমকাই তিরিশ-চল্লিশ বছর পিছিয়ে যায় মন। দেখতে পাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লাইব্রেরি ভবনের পাশেই একদা বিখ্যাত হাকিম ভাইয়ের চায়ের দোকানের পাশে এক সকালে বসে আছেন অভিনেতা, নাট্যকার হাবিবুল হাসান। তখনও চায়ের দোকান আর সংলগ্ন মাঠটাকে ঘিরে তরুণ আড্ডাধারীদের কলরব শুরু হয়নি। টিভি-বাক্সের সাদাকালো যুগে ‘সকাল সন্ধ্যা’ নামে এক ধারাবাহিকে ক্ষ্যাপাটে যুবকের চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতিমান হয়েছিলেন। চরিত্রের নাম ছিল ‘মাখনা ভাই’। একটা সময়ে কাছের মানুষ, নিয়মিত আড্ডার সঙ্গীরাও তাকে এই নামেই সম্বোধন করত। অদ্ভুত স্বভাবের জন্য আলোচিত ছিলেন হাবিবুল হাসান।
ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন নাটকের চরিত্রের মতো বোহেমিয়ান, উৎক্ষিপ্ত। বয়সে বড়, তাই ভাই বলে সম্বোধন করতাম। হাবিব ভাই মাঝে মাঝে ক্যাম্পাসে আসতেন বাম হাতে তিনটি ঘড়ি বেঁধে। তার সঙ্গে বহুদিন গেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, কার্জন হল, দোয়েল চত্বর আর শাহবাগে চক্কর কেটে। তিনটি ঘড়ি নিয়ে প্রশ্ন করলে বলেছিলেন, ‘সময় হইল গুরুত্বপূর্ণ; তাই তিনটা ঘড়িতে তারে আটকানোর চেষ্টা করি। তারপরেও তো পারি না।’
তার সঙ্গে প্রথম দেখা আশির দশকের গোড়ায় শহীদ মিনারের সামনে। রাস্তা কাঁপাচ্ছেন একক অভিনীত নাটক ‘বাসন’-এ অভিনয় করে। ব্যক্তিগত পরিচয়ের গণ্ডি প্রসারিত হয়েছিল তার বন্ধু প্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর মাধ্যমে। কাঁধে একটা ব্যাগ, ময়লাটে নীল শার্ট আর জিন্স প্যান্ট পরিহিত সেই পাগলাটে মানুষটির সঙ্গে আচমকা দেখা হয়ে যেত এই শহরে। দেখা হলে এমন ভঙ্গীতে তাকাতেন, মনে হতো, সেবারই আমাদের প্রথম পরিচয়। অন্য দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন অচেনা মানুষের মতো। আবার আচমকাই সব আড্ডা, আমাদের সব কলরব ফেলে উধাও হয়ে যেতেন। আবার বহুদিন পর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়তেন আমাদের আড্ডায়। সঙ্গে থাকতেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আনিস আহমেদ।
মাঝে মাঝে তাকে হাকিম ভাইয়ের চায়ের দোকান থেকে সামান্য দূরে একটা ভাঙা দেয়ালের ওপর চুপ করে বসে থাকতে দেখা যেত। ওই দেয়ালের ওপর একটা বড় ছাতিম গাছ ছিল। কেউ নাম দিয়েছিল, ‘ছাতিম তলা’। ধ্যান করার ভঙ্গীতে বসে থাকা তাকে দেখে খানিক ভয় পেয়ে দূরে সরে থাকতাম। কে জানে, হঠাৎ হয়ত রেগে গিয়ে বকাবকি করতে শুরু করবেন। আবার কখনো তাকে দেখা যেত চারুকলার উল্টোদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পায়চারি করতে। কখনো বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গে কথা বলতেন, আবার কখনো চিৎকার করে উদ্ভট সব দুই লাইনের ছড়া কাটতেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় আট বছরের সম্পর্ক চুকেবুকে যাবার পরেও তার সঙ্গে দেখা হতো দোয়েল চত্বরের কাছাকাছি একটা মিট মিট করে চলা চায়ের দোকানে। একটু দূরেই ডানা মেলে স্থির হয়ে আছে বিশাল কংক্রিটের পাখি আর অন্যদিকে অস্থির হাবিবুল হাসান। তারপর একদিন সেই অস্থির ভূগোলে আলোড়ন ফেলা বাসিন্দার ছায়া মিলিয়ে গেল। এই ঢাকা শহরে আর কোথাও দেখা হয় না তার সঙ্গে। এখন কোথায় তরঙ্গ তৈরি করছেন মাখনা ভাই কে জানে!
ভীষণ মেধাবী নাট্যকার, খামখেয়ালী অভিনেতা আর অস্থির প্রাণ হাবিবুল হাসান হয়ত এই শহরেই আছেন। কিন্তু আর দেখা হয় না। মনের বহু দরজার একটি দিয়ে প্রবেশ করে আবার বের হয়ে গেছেন অন্য দরজা দিয়ে। কিন্তু মনের মধ্যে আজও শব্দ তোলে তার স্মৃতির নুড়ি পাথর।



