আগামীর সময়

দ্বিমুখী নীতি জাতি ও সমাজের জন্য বিপদ সংকেত

দ্বিমুখী নীতি জাতি ও সমাজের জন্য বিপদ সংকেত

মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠে বিশ্বাসের ওপর। একটি কথা, একটি আচরণ, একটি মুখ; এই সামান্য বিষয়গুলোর ওপরই নির্ভর করে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক শান্তি। কিন্তু যখন মানুষ নিজের স্বার্থে মুখ বদলায়, কথা বদলায়, রূপ বদলায়; তখন সেই সম্পর্কের ভিত ভেঙে পড়ে। ইসলাম এমন ভাঙনের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেছে। ইসলামের ইতিহাসে এ সকল ঘটনার জানা যায়।

জান-মালের নিরাপত্তা এবং যুদ্ধ লব্দ মালের ভাগ পাওয়ার জন্য মুনাফিকরা মুসলমানদের নিকট এসে ঈমান, বন্ধুত্ব ও মঙ্গল কামণার কথা বলে তাঁদেরকে ধোকায় ফেলতো। আর যখন নিজের (অবিশ্বাসীদের) দলে থাকতো তখন তাদের হয়ে কথা বলতো। এ ধরনের চরিত্র হচ্ছে দ্বিমুখী চরিত্র বা সুবিধাবাদী চরিত্র। মুনাফিকদের এ দ্বিমুখী চরিত্রের ফলে আল্লাহ এ আয়াত নাজিল করেন

বিশেষ করে যে চরিত্র মানুষকে বাইরে ভালো, ভেতরে বিষাক্ত করে তোলে; সে চরিত্রের নাম দু’মুখোপনা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ভয়ংকর স্বভাব সম্পর্কে বলেছেন,

"‏ تَجِدُ مِنْ شَرِّ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عِنْدَ اللَّهِ ذَا الْوَجْهَيْنِ، الَّذِي يَأْتِي هَؤُلاَءِ بِوَجْهٍ وَهَؤُلاَءِ بِوَجْهٍ ‏"‏‏.‏

‘কিয়ামতের দিন তুমি আল্লাহর কাছে ঐ লোককে সব থেকে খারাপ পাবে, যে দু’মুখো। সে এদের সম্মুখে এক রূপ নিয়ে আসতো, আর ওদের সম্মুখে অন্য রূপে আসত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৫৮)


‍উল্লিখিত, হাদিস শুধু একটি নৈতিক উপদেশ নয়; এটি কিয়ামতের বিচারে মানুষের অবস্থান নির্ধারণ করে দেওয়া এক কঠিন ঘোষণা।


হাদিসটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত চরিত্র কেমন। এখানে ‘সবচেয়ে খারাপ’ বলা হয়েছে। এটি কোনো হালকা শব্দ নয়। ইবাদতের ঘাটতি, আমলের দুর্বলতা নয়; বরং চরিত্রের এই বিকৃতি মানুষকে আল্লাহর দরবারে চরম অপমানের স্থানে পৌঁছে দেয়।


দু’মুখো মানুষ সেই ব্যক্তি, যে এক দলের কাছে গিয়ে অন্য দলের বিরুদ্ধে কথা বলে, আবার অন্য দলের কাছে গিয়ে প্রথম দলের বিরুদ্ধে কথা তোলে। কোথাও সে প্রশংসাকারী, কোথাও সে নিন্দুক। তার মুখে সত্য নয়, তার মুখে সুবিধা। এমন মানুষ সমাজে আগুন লাগায়, সম্পর্ক ভাঙে, বিশ্বাস ধ্বংস করে।

কুরআন মাজিদেও এ ধরনের মানুষের চরিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা দোদুল্যমান; না এদের দলে, না ওদের দলে।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪৩)

এই আয়াতে মুনাফিকদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। তারা কোনো অবস্থানেই স্পষ্ট নয়। সত্যের পক্ষে দৃঢ় নয়, আবার মিথ্যার পক্ষেও পুরোপুরি নয়। সুবিধার পাল্লা যেদিকে ভারী হয়, তারা সেদিকেই ঝুঁকে পড়ে। এটাই দু’মুখোতার মূল।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য এক হাদিসে মুনাফিকের আলামত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আর আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে ‘ (বুখারি ও মুসলিম)

দু’মুখো আচরণ এই তিনটির সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িত। কারণ যে ব্যক্তি দুই জায়গায় দুই কথা বলে, সে মূলত সত্যকে আড়াল করে। সে বিশ্বাস ভাঙে, সম্পর্ক ভাঙে, সমাজে সন্দেহ ও বিভাজনের বীজ বপন করে। এমন ব্যক্তি হয়তো সাময়িকভাবে লাভবান হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সে নিজেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়; মানুষের কাছেও, আল্লাহর কাছেও।

ইসলাম চায় মুমিন হোক স্বচ্ছ, স্পষ্ট ও একমুখী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা সত্যকে আঁকড়ে ধরো। সত্য নেকির দিকে নিয়ে যায়, আর নেকি জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।’
(বুখারি ও মুসলিম) সত্যবাদিতা মানে শুধু মিথ্যা না বলা নয়; বরং সব পরিস্থিতিতে একই রূপে থাকা, একই নৈতিক অবস্থানে অটল থাকা। সামনে এক কথা, পেছনে আরেক কথা—এটি শুধু সামাজিক অসভ্যতা নয়, এটি ঈমানের জন্যও মারাত্মক হুমকি।

হজরত আবু বকর, ওমর, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম একবার মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে সলুল ও তার সহচরদেরকে নসিহত করার জন্য গেলেন। সাক্ষাতে তাঁরা বলরেন, হে উবাই! তুমি এবং তোমরা সঙ্গীরা আমাদের সঙ্গে খাঁটি ঈমান নিয়ে বসবাস কর। তখন ইবনে সলুল তাঁদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদাভাবে প্রশংসার সঙ্গে স্বাগতম জানালে হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, মুনাফিকী না করে আল্লাহকে ভয় কর। জবাবে ইবনে সলুল বলল, আমার ঈমান তোমাদের ঈমানের মতোই এবং আমি যা বলছি অন্তর থেকেই বলছি। অতপর সে তার গোত্রের লোকদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, যখন তোমরা মুসলমানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন আমার মতো বাক্যালাপ করবে। তখন তার সঙ্গীরা বলল, তুমি যতদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে, ততদিন আমরা কল্যাণের মাঝে থাকবে (নাউজুবিল্লাহ)



দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা শয়তানের কাজ। আল্লাহ দ্বিমুখী নীতি অবলম্বকারীদের শয়তান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

আল্লাহ তাদের সঙ্গে উপহাস করবেন অর্থাৎ তারা যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে।

কিয়ামাতের দিন কপট বিশ্বাসী পুরুষ-নারীরা মুমিনদেরকে বলবে, তোমরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা কর, আমরাও কিছু আলো নিব তোমাদের জ্যোতি থেকে। বলা হবে, তোমরা পিছনে ফিরে যাও ও আলোর খোঁজ কর। অতপর উভয় দলের মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর, যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আজাব। (সুরা হাদিদ : আয়াত ১৩)


আজ আমাদের সমাজে, পরিবারে, রাজনীতিতে, এমনকি ধর্মীয় পরিমণ্ডলেও দু’মুখো আচরণ ভয়ংকরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই আসুন, আমরা নিজেদের মুখ, কথা ও অবস্থান এক করি। যেখানে যা বলি, সেখানেই তার দায় নেই। মানুষের সামনে যেমন, আল্লাহর সামনে তেমন হওয়ার চেষ্টা করি।

আল্লাহ আমাদেরকে সত্যবাদী, একমুখো ও আন্তরিক বান্দা হিসেবে কবুল করুন। কিয়ামতের দিন যেন তিনি আমাদেরকে “সবচেয়ে খারাপ” নয়, বরং তাঁর সন্তুষ্ট বান্দাদের কাতারে স্থান দেন; এই দোয়াই হোক আমাদের সবার প্রার্থনা। আমিন ।

    শেয়ার করুন: