কেন কোরবানি করেন মুসলিমরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঈদুল আজহা এলেই মুসলিম বিশ্বের ঘরে ঘরে এক বিশেষ আবহ তৈরি হয়। নতুন পোশাক, তাকবিরের ধ্বনি, ঈদের নামাজ, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা আর কোরবানির প্রস্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কিন্তু প্রতি বছরই একটি প্রশ্ন অনেকের মনে জাগে; মুসলিমরা কেন কোরবানি করেন? কেন একটি পশু জবাইকে এত বড় ইবাদত হিসেবে দেখা হয়? এটি কি কেবল একটি ধর্মীয় ঐতিহ্য, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো শিক্ষা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় মানব ইতিহাসের এক আবেগঘন ঘটনায়। এমন এক ঘটনার কাছে, যা শুধু ইসলামের ইতিহাসেই নয়; আত্মসমর্পণ, ভালোবাসা ও ত্যাগের ইতিহাসেও অনন্য।
মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, মহান আল্লাহ তার প্রিয় নবী ইবরাহিম (আ.)-কে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তার সবচেয়ে প্রিয় সন্তান ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করছেন। নবীদের স্বপ্ন ছিল ওহির অংশ। অর্থাৎ এটি ছিল আল্লাহর নির্দেশ।
একজন পিতা হিসেবে ইবরাহিম (আ.)-এর হৃদয়ে তখন কী ঝড় বয়ে গিয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বার্ধক্যে পাওয়া সন্তান, বহু প্রতীক্ষার ধন, হৃদয়ের সবচেয়ে কোমল অংশ; সেই সন্তানকেই আল্লাহর পথে উৎসর্গ করার নির্দেশ! কিন্তু ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের আবেগকে প্রাধান্য দেননি।
পবিত্র কোরআনে এসেছে, তিনি যখন তার পুত্রকে বিষয়টি জানালেন, তখন ইসমাইল (আ.) বলেছিলেন—
يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ
‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত : ১০২)
এ যেন আত্মসমর্পণের এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। একদিকে পিতা, অন্যদিকে পুত্র; উভয়েই নিজেদের ভালোবাসা ও অনুভূতিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির কাছে সমর্পণ করে দিলেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আল্লাহ ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন। বুঝিয়ে দিলেন, আল্লাহ রক্ত চান না; তিনি দেখতে চান বান্দার আনুগত্য।
সেই স্মৃতির ধারাবাহিকতাতেই মুসলিমরা প্রতি বছর কোরবানি করেন। তবে ইসলাম খুব স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে, কোরবানির আসল উদ্দেশ্য পশুর রক্ত নয়; বরং মানুষের অন্তরের তাকওয়া।
আল্লাহতায়ালা বলেন—
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ
‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কোরবানির গোশত কিংবা রক্ত; পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩৭)
এই আয়াতই কোরবানির মূল দর্শনকে স্পষ্ট করে। আল্লাহ মানুষের পশু জবাইয়ের প্রয়োজন অনুভব করেন না। তিনি চান মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তন। কোরবানি মানুষকে শেখায়, পৃথিবীর কোনো কিছুই আল্লাহর চেয়ে বেশি প্রিয় হতে পারে না।
একটি সুস্থ ও মূল্যবান পশু কেনা, তারপর সেটি আল্লাহর নামে কোরবানি করা এবং তার অধিকাংশ মাংস অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া; এ কাজ মানুষের ভেতরের স্বার্থপরতাকে ভাঙতে সাহায্য করে। মানুষ বুঝতে শেখে, সম্পদ কেবল নিজের ভোগের জন্য নয়; বরং সমাজের অন্য মানুষেরও অধিকার রয়েছে তাতে।
কোরবানির একটি গভীর সামাজিক দিকও আছে। ঈদুল আজহার সময় বহু দরিদ্র পরিবার বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ভালো খাবার খাওয়ার সুযোগ পায়। অনেক পরিবার আছে, যারা হয়তো সারা বছর মাংস কিনে খেতে পারে না। কিন্তু কোরবানির ঈদে তাদের ঘরেও মাংস পৌঁছে যায়। ফলে কোরবানি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি সামাজিক সহমর্মিতা ও সম্পদের পুনর্বণ্টনেরও একটি অনন্য ব্যবস্থা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও কোরবানির গোশত নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও গরিবদের মধ্যে বণ্টন করতেন। ইসলামী শিক্ষায় সাধারণত কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করার কথা বলা হয়; এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর জন্য এবং এক ভাগ গরিবদের জন্য। যদিও এটি আবশ্যিক বিধান নয়; কিন্তু এর মাধ্যমে সমাজে সৌহার্দ্য, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
কোরবানি মানুষকে কৃতজ্ঞতা শেখায়। প্রতিদিন মানুষ যে খাবার খায়, তার পেছনে কত নিয়ামত ও কত সৃষ্টি জড়িয়ে আছে, তা অনেক সময় উপলব্ধিই করে না। কিন্তু কোরবানির সময় মানুষ খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করে, একটি প্রাণী মানুষের খাদ্যের জন্য উৎসর্গ হচ্ছে। তখন তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার অনুভূতি জাগে।
তবে ইসলাম কোরবানিকে কষ্টকর কোনো বিধান বানায়নি। যিনি আর্থিকভাবে সক্ষম নন, তার ওপর কোরবানি আবশ্যক নয়। ইসলাম এমন কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় না, যা মানুষের সাধ্যের বাইরে। শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি বা আর্থিকভাবে অক্ষম মানুষ কোরবানি না করলেও কোনো গুনাহ হবে না।
কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট কিছু পশুই বৈধ; যেমন ছাগল, ভেড়া, গরু ও উট। পশুকে সুস্থ ও ত্রুটিমুক্ত হতে হয়। কারণ ইসলাম শিক্ষা দেয়, আল্লাহর পথে সর্বোত্তম জিনিস উৎসর্গ করতে।
বর্তমান সময়ে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। কোথাও কোথাও এটি প্রতিযোগিতা, প্রদর্শনী বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের উপলক্ষে পরিণত হয়। অথচ কোরবানির আসল চেতনা হলো বিনয়, তাকওয়া ও আত্মত্যাগ। কোরবানি মানুষকে শেখায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিসও ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে।
মূলত কোরবানি পশুর নয়, মানুষের অন্তরের পরীক্ষা। এটি রক্তের নয়, সম্পর্কের পরীক্ষা। মানুষ তার সম্পদ, অহংকার, লোভ ও আসক্তির ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, কোরবানি সেই শিক্ষাই দেয়।
প্রতি ঈদুল আজহায় তাই মুসলিমরা শুধু একটি পশু জবাই করেন না; বরং তারা নতুন করে স্মরণ করেন ইবরাহিম (আ.)-এর সেই মহান আত্মসমর্পণ, যা মানবজাতিকে শিখিয়েছে; আল্লাহর ভালোবাসার সামনে পৃথিবীর সব ভালোবাসাই ছোট।
-গালফ নিউজ অবলম্বনে মুফতি সাইফুল ইসলাম




