বাংলাদেশে সুকুক: বাস্তবতা ও ভবিষ্যত সম্ভাবনা

ছবি: আগামীর সময়
ইসলামিক ফাইন্যান্সের অন্যতম আধুনিক হাতিয়ার সুকুক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০২০ সালে প্রথম সার্বভৌম সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে যাত্রা শুরু হওয়ার পর গত পাঁচ বছরে এটি সরকারের অবকাঠামো অর্থায়নের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সরকার ৮টির বেশি বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুক (BGIS) ইস্যু করেছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক ৮ম সুকুকের আকার ৫,৯০০ কোটি টাকা, মেয়াদ ৭ বছর এবং বার্ষিক রেন্টাল রেট ১০.৪০ শতাংশ। প্রতিটি ইস্যুতে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ৭ম সুকুকের বিপরীতে ২,৫০০ কোটি টাকার অফারের বিপক্ষে ২৮,৭২১ কোটি টাকার বিড জমা পড়েছিল—যা অসাধারণ ওভারসাবস্ক্রিপশনের প্রমাণ।
সুকুক মূলত ইজারা (লিজ) এবং ইস্তিসনা ভিত্তিতে ইস্যু হয়। এতে বিনিয়োগকারীরা সুদ পান না, বরং বাস্তব সম্পদের (রাস্তা, সেতু, পানি প্রকল্প ইত্যাদি) ভাড়া বা মুনাফার অংশ পান। অর্থ ব্যবহৃত হয় গ্রামীণ অবকাঠামো, পানি সরবরাহ, রাস্তা প্রশস্তকরণ, স্কুল-কলেজ নির্মাণসহ বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রকল্পে। ন্যূনতম ১০,০০০ টাকা দিয়ে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা অংশ নিতে পারেন।
সুকুকের বাজার এখনো শৈশবকাল অতিক্রম করেনি। সেকেন্ডারি মার্কেটের লিকুইডিটি অপর্যাপ্ত, ফলে বিনিয়োগকারীরা মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অর্থ আটকে রাখতে বাধ্য হন। কর্পোরেট সুকুক ইস্যু খুবই সীমিত। শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ডে পূর্ণ ঐক্যমত্য ও স্বচ্ছতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে সুকুক সম্পর্কে সচেতনতা এখনো কম।
তবে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্টের জন্য সুকুক একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে দেশে ইসলামিক ব্যাংকিং সেক্টর দ্রুত বাড়ছে, যা সুকুকের চাহিদাকে আরও বাড়াবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক নীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে আগামী ৫ বছরে সুকুক মার্কেট ১ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। গ্রিন সুকুক, কর্পোরেট সুকুক এবং আন্তর্জাতিক ডলার ডিনোমিনেটেড সুকুক ইস্যু করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব। মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের মতো দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে স্বতন্ত্র শরিয়াহ বোর্ড, সক্রিয় সেকেন্ডারি মার্কেট এবং কর ছাড়সহ প্রণোদনা দিলে এ খাত আরও শক্তিশালী হবে।
সুকুক শুধু সরকারের ঋণের বোঝা কমাবে না, বরং নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও বাস্তব সম্পদভিত্তিক অর্থনীতির প্রসার ঘটাবে। এটি হালাল বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ আয়ের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যদি জনসচেতনতা বাড়ানো, রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং কর্পোরেট সেক্টরকে উৎসাহিত করতে পারে, তাহলে সুকুক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গেম চেঞ্জার হয়ে উঠবে। দেশের উন্নয়নে অংশ নিতে চাইলে সুকুক একটি শরিয়াহসম্মত ও লাভজনক বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারে।
লেখক: শায়খুল হাদীছ ও বিভাগীয় প্রধান, জামিয়াতুল ইমাম মুসলিম রহ কক্সবাজার। সদস্য, শরীয়াহ সুপারভাইজারী কমিটি, সোনালী ব্যাংক পিএলসি।




